দোহায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক নিয়ে ধোঁয়াশা
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ জুন ২০২৬, ৯:১৯ অপরাহ্ণ
দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রস্তুতি নিলেও ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো বৈঠকের সময়সূচি নেই। এদিকে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
চলতি সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচক দলের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও সোমবার (২৯ জুন) ইরান জানিয়ে দিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চার মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতিও নতুন করে চাপে পড়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে আলোচনার নেতৃত্ব দিতে পাঠাচ্ছেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, কাতারে ইরানের কারিগরি প্রতিনিধিদল গেলেও তাদের সফরের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং দুই পক্ষের মধ্যে কোনো আলোচনার সময়সূচিও নির্ধারিত হয়নি।
বাঘাই বলেন, আগামী দিনগুলোতে আমরা মার্কিন পক্ষের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই কোনো আলোচনা বৈঠক করব না।
এই মতপার্থক্য ১৭ জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভঙ্গুরতাই আবারও সামনে এনেছে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল এমন একটি সংঘাত থামানো, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যাহত করেছে এবং নভেম্বরের কংগ্রেসীয় নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে অন্তত ৬০ দিন সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অগ্রগতি ধীরগতির এবং উভয় পক্ষই একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়েছে।
ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়নি এবং এই চুক্তি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উত্তেজনা লেবাননে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকেও জটিল করে তুলেছে। হিজবুল্লাহর মিত্র ও লেবাননের সংসদ স্পিকার নাবিহ বেরি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন।
হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৩০ জুন) দোহায় একটি বৈঠক হতে পারে। তবে এটি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আগের কারিগরি বৈঠকের মতো হবে না। এবারের আলোচনার মূল বিষয় হবে হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা এবং উত্তেজনা প্রশমন।
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, বুধবার (১ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কারিগরি প্রতিনিধিদল কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করতে পারে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, দোহায় বৈঠকটি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ হবে, হয়তো হবে না। আমরা তা জানতে পারব।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে এগিয়ে রয়েছে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে মাশুল আদায় এবং নির্ধারিত পথের বাইরে চলাচলকারী জাহাজকে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মাধ্যমে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হেনেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান রবিবার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
সোমবার স্টিভ উইটকফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফোনে কংগ্রেস সদস্যদের ইরান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। রিপাবলিকান সিনেটর স্টিভ ডেইন্স ওই আলোচনা ‘গঠনমূলক’ বলে মন্তব্য করলেও, সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ব্রিফিংকে ‘ত্রুটিপূর্ণ এবং বিশদ বিবরণের অভাবযুক্ত’ বলে সমালোচনা করেন।
শুমারের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি যে এই সংঘাতের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করেছে। তাঁর দাবি, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রভাব বজায় রেখে তেল থেকে বিপুল রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, কাতারে জব্দ থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করে ইরানে ফেরত আনা হবে। তিনি ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকা সমঝোতা স্মারককে ‘ইরানি জনগণের জন্য এক বিরাট বিজয়’ বলে আখ্যা দেন।
চলকি সপ্তাহে সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, উত্তেজনা কমাতে তিনি ওমানের সঙ্গে কাজ করছেন এবং হরমুজ প্রণালী মাইনমুক্ত করতে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করবেন।
তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ১৪ দফা পরিকল্পনা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণের কাজ শুধুমাত্র ইরানই করবে। একই সঙ্গে তিনি পরিস্থিতি আরও জটিল না করতে ফ্রান্সকে সতর্ক করেন।
- নীরব চাকলাদার



