বিদেশিদের জন্য যে কারণে ভিসা ফি ৪০০% বাড়াচ্ছে জাপান
সিকডে
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ জুন ২০২৬, ৩:০২ অপরাহ্ণ
জাপান বিদেশিদের জন্য ভিসা ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক পর প্রথমবারের মতো এই ফি পুনর্নির্ধারণ করা হলো, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ভিসার খরচ পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সিএনবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন হার কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে জাপান সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার ফি ৩ হাজার ইয়েন (প্রায় ১৮ দশমিক ৬৯ মার্কিন ডলার) থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ইয়েন করা হয়েছে।
জানা যায়, ১৯৭৮ সালের পর এই প্রথম ভিসা ফি বাড়াল টোকিয়ো। পর্যটনের জোয়ারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান খরচ ও বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাপান বলেছে, ‘বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি ও বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই’ ভিসা ফি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত। ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে জাপান সরকারের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে মুদ্রাটির দাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কারণ পর্যটনের এই বিপুল চাপের ফলে দেশটির সামগ্রিক অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর ব্যাপক ধকল যাচ্ছে।
জেমস কুক ইউনিভার্সিটির হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র লেকচারার জিলমিয়াহ কাম্বলে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানি ইয়েনের টানা অবমূল্যায়নের কথা মাথায় রাখলে, বহু আগের ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্ধারণ করা ফি-র পুরনো কাঠামো ধরে রাখা হয়তো আর আর্থিকভাবে লাভজনক হচ্ছিল না।
এই ফি বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য অতিরিক্ত পর্যটকদের ভিড় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা নয় উল্লেখ করে কাম্বল বলেন, ভিসা ফি বৃদ্ধি সরাসরি পর্যটকদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের উপায় না হলেও, ক্রমবর্ধমান দর্শনার্থীদের সামলানোর প্রশাসনিক ও পরিচালন খরচের কিছুটা অন্তত এর মাধ্যমে মেটানো যাবে।
এদিকে ভিসা ফি বৃদ্ধির ফলে জাপানের পর্যটন ব্যবসায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই বলেই জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি।
জানা যায়, ভিসা ফি বাড়ানোর পাশাপাশি সব ভ্রমণকারীর জন্য ডিপার্চার ট্যাক্সও ১ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ইয়েন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডেলয়েট তোহমাতসু গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও পার্টনার ইউকি মাসুজিমা বলেন, জাপান থেকে রওনা দেওয়া যাত্রীদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, এই পরিবর্তন মূলত তারই প্রতিফলন।
জাপান থেকে রওনা দেওয়া যাত্রীদের মধ্যে বর্তমানে ৭৪ শতাংশই বিদেশি পর্যটক। ২০১৩ সালে আবেনোমিকস চালুর আগে এই হার ছিল ২০-৩০ শতাংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আবেনোমিক্স হলো প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের আমলের অর্থনৈতিক কর্মসূচি, যার জেরে ইয়েনের অবমূল্যায়ন ঘটার পাশাপাশি দেশটিতে বিদেশি পর্যটক আসা বেড়েছিল।
মাসুজিমা আরও বলেন, পর্যটকেরা যেহেতু সেলস ট্যাক্স রিফান্ড পান, তাই এর সঙ্গে যুক্ত আনুষঙ্গিক খরচের কিছুটা অন্তত জাপানকে মেটাতে হবে। ভিসা ফি ও ডিপার্চার ট্যাক্স বাড়িয়ে আংশিকভাবে সেই ঘাটতি পূরণ সম্ভব।
তবে মাসুজিমা বলেন, কর বাড়ালেও পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হবে বলে মনে করেন না মাসুজিমা। জাপানে আসা পর্যটকদের অনেকেই দ্বিতীয় বা তার বেশিবার দেশটি ভ্রমণ করছেন। অর্থাৎ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জাপানের আবেদন দীর্ঘস্থায়ী।
রাজনৈতিক সমীকরণ
ডেন্টসু-র করা জাপান ব্র্যান্ড সার্ভে ২০২৫-এ দেখা গেছে, ১২ হাজার ৪০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৫২.৭ শতাংশই জানিয়েছেন যে তারা আবার জাপানে যেতে চান। সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ২০টি পর্যটন বাজারের মধ্যে জাপানই প্রথম স্থানে রয়েছে।
সংস্থাটির সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ইয়েন দুর্বল হওয়ার চেয়েও জাপানের খাবার ও বিভিন্ন পণ্যের আকর্ষণই পর্যটকদের বেশি টেনে আনছে। অর্থাৎ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জাপানের এই জনপ্রিয়তা সাময়িক উন্মাদনা নয়।
পর্যটনের এই বিপুল চাহিদাই নীতিনির্ধারকদের ফি বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে। ফলে পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বড় ঝুঁকি নেই বলে উল্লেখ করেন মাসুজিমা।
মে মাসে জাপানের উচ্চকক্ষ পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি আবেদনের ফি-র ঊর্ধ্বসীমা বর্তমান ১০ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ইয়েন করার আইন পাশ করেছে। একইসঙ্গে রেসিডেন্সি স্ট্যাটাস পরিবর্তনের ফি-র ঊর্ধ্বসীমাও ১০ হাজার ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ইয়েন করা হচ্ছে।
এই ফি বৃদ্ধির কারণ মূলত দুটি জানিয়ে কোল বলেন, প্রথমত, অভিবাসন ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো; দ্বিতীয়ত, দেশে আরও উন্নত মানবসম্পদকে আকর্ষণ করা।
এম এইচ আ



