চোখের সামনে ভেসে যাওয়া স্মৃতি এখনো কাঁদায় আফিয়াকে
সোহেল মিয়া,দোয়ারাবাজার(সুনামগঞ্জ)
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণবন্যার দিন পরিবারের সবাইকে আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠিয়ে বৃদ্ধ স্বামীকে নিয়ে বাড়িতে ছিলাম কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই পানিতে তলিয়ে যায় সবকিছু। কোনোমতে বুক সমান পানির মধ্য দিয়ে প্রতিবেশির উচু বাড়িতে উঠে পরি। আর যদি এক মিনিট দেরি করতাম তাহলে পানির শ্রোতে ডুবে যেতাম। হয়তো বেঁচে ফেরা হতো না।’
এভাবেই নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ২০২২ সালের (১৬-জুন)ভয়াবহ বন্যার দিনের স্মৃতিচারণ করছিলেন ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের দ্বীনেরটুক গ্রামের বাসিন্দা আফিয়া বেগম(৬০),তিনি ওই গ্রামের মফিজ আলী’র স্ত্রী।
সীমান্তবর্তী গ্রামীন জনগোষ্ঠীর এই জনপদে বর্তমানে অতিবৃষ্টির প্রভাবে আতঙ্কিত যখন পুরো এলাকা তখন সেই ভয়াবহ বন্যার দিনের কথা মনে করে তিনি আরও বলেন, বন্যার ৩ দিন আগে ছেলেকে বিয়ে করাই,বন্যার দিন বাড়িতে অনেক আত্মীয় স্বজন ছিলো।
সকালে আত্মীদের ও নিজেদের জন্য খাবার রান্নার শেষ পর্যায়ে হঠাৎ বন্যায় ঘরবাড়ি সব তলিয়ে যায়। রান্না করা খাবার গুলো ফেলে দিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য ছেলে-মেয়েদের আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠিয়ে আমার স্বামীসহ বাড়িতে ছিলাম। এর আগেরদিন নদীতে পানি থাকলেও রাতের দিকে পানি কমে যায়। সকাল হতেই পশ্চিম দিক থেকে অতি জোরে বাতাস শুরু হয় এবং সাথে পানিতে আশপাশের এলাকা তালিয়ে যায়।
‘আমার বাড়ি বেড়িবাঁধের কাছাকাছি হওয়ায় আমরা আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে বেড়িবাঁধের দিকে খুব দ্রুত ছুটি। এর মধ্যেই আমার বুক সমান পানি হয়ে যায় পরে কোনোমতে পায়ে বেড়িবাঁধের মাটি পেয়ে নিরাপদে উঠি’।
তিনি বলেন, একটু দেরি হলেই আর হয়তো রক্ষা পেতাম না, কারণ নদীর পানির এত শ্রোত আর তার পাশেই ছিল বিশাল পুকুর সেখানে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতাম। আমাদের বসতঘরটি রক্ষা হয়নি। চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখেছি নিজের শেষ সম্ভলটি। বন্যায় আমরা বেঁচে থাকলে বসতঘরে থাকা ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে দেওয়া আসবাবপত্র, ফার্নিসার,ধান, চাউল,কাপড় চোপড় সব নিমিশেই চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুধু দেখেছি আর কান্না করেছি। বেশকিছু পশু-পাখী মারা যায়। ওইদিন আমরা কিছু খায়নি। রাত থেকে পরের ৫ দিন এলাকার মানুষদের দেওয়া খাবার খেয়েছি।
বন্যার দিন থেকে পাঁচদিন বাড়িতে আসতে পারিনি। পাঁচদিন পর এসে দেখি আমরা নিঃস্ব,পানিতে ভেসে যাওয়া বাড়ির ভিট ছাড়া কিছুই নেই,আছে শুধু শত স্মৃতি। ভিটে মাচা বেঁধে বসবাস শুরু করি। গ্রামের এক যুবক একহাজার টাকা দিলে বাজার থেকে খাদ্যসামগ্রী কিনে আনি।
কয়েকদিন পর পাশের গ্রামের রফিকুর রহমান ও ফখরুদ্দিন নামের দু’জন স্বেচ্ছাসেবক আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসে দেখতে পান আমাদের করুন অবস্থা। তারা নরসিংপুর ইউনিয়ন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ইউকে নামক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের কষ্টের কথা জানান। ১০ অক্টোবর নরসিংপুর ইউনিয়ন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ইউকে আমাকে টিনসেটের একটি পাঁকা ঘর নির্মান করে দেন। আলহামদুলিল্লাহ তাদের দেওয়া বসতঘরে আমি ছেলে মেয়েদের নিয়ে শান্তিতে ঘুমাচ্ছি। আল্লাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ইউকের সবার মঙ্গল করুন।
তিনি আরও জানান,বন্যার পর ১৫ দিন একই কাপড় পরিধান করে জীবন পরিচালনা করেন তারা। পরে নববিবাহিত ছেলের শ্বশুর বাড়ি হতে সবার জন্য কিছু জামাকাপড় নিয়ে আসেন তা দিয়ে এখনো জীবন চালাচ্ছে এই পরিবার।
আফিয়া বেগম বলেন,ওইদিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক একটি দিন। আবহাওয়া খারাপ হলেই সেদিনের স্মৃতি সামনে আসে। বুকটা কেঁপে ওঠে ওইদিনের মতোই তাই এখন বন্যা হবে শুনলেই নিরাপদে স্থানে চলে যায়।
সারাদেশসংবাদ/হান্নান





