ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক : হাওরপাড়ে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ মে ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পর সুনামগঞ্জের হাওরে এখন ঝলমলে রোদের দেখা মিলেছে। কিন্তু এ রোদ কৃষকের জীবনে স্বস্তি নয়, বরং নতুন করে হতাশা ও কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। চোখের সামনে পানির নিচে ডুবে থাকা সোনালি ধান এখন দ্রুত পচে যাচ্ছে। পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছেও মড়ক দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
হাওরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক কৃষক পানির নিচে অর্ধেক ধান রেখেই ধান কর্তনের সমাপ্তি টেনেছেন। তারা বলছেন, এখন আর ধান কাটার মতো পরিস্থিতি নেই। একদিকে পানিতে ডুবে ধান নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট ও অতিরিক্ত খরচ তাদেরকে চরম বিপদে ফেলেছে।
তবে কৃষকদের এমন বাস্তবতার বিপরীতে কৃষি বিভাগের দৈনিক প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, হাওরের ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এ তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন কৃষক, কৃষক সংগঠন ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি, মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি হিসাবের কোনো মিল নেই।
দিরাই উপজেলার কালিয়াকোটা হাওরপাড়ের কাইমা গ্রামের গ্রামের কৃষক পারভেজ বলেন, ধান লাগাতে জমি চাষ, সার, বীজ, শ্রমিক-সব মিলিয়ে যে টাকা খরচ করেছি, ধান বিক্রি করে তা উঠবে না। পানির নিচে অনেক ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এখন যে ধান পাচ্ছি, সেটা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলার চায়ারহাওর পাগড়ের কার্তিকপুর গ্রামের বর্গাচাষি আমিনুর রশিদ বলেন, জমি অন্যের, চাষ করছি আমরা। এখন ধান কম হয়েছে। মহাজনের টাকা দিতে হবে, আবার এনজিওর কিস্তিও আছে। তাই ভাবছি ধান তুলে ঢাকায় চলে যাব।
খরচার হাওরে পাড়ের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক কেরামত আলী বলেন, ধানের খলায়ও এখন এনজিও কর্মীরা আসে। কিস্তি না দিলে চাপ দেয়। এভাবে কৃষক বাঁচবে কিভাবে? এখন কিস্তিরি টাকা পরিশোধ করমো না ছেলে মেয়ে নিয়ে জীবন বাঁচামো।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর পাড়ের কৃষক মমিন ইসলাম বলেন, হাওরের অর্ধেক ধান এখনো পানির নিচে। সরকার বলছে ধান কাটা শেষ, কিন্তু বাস্তবে কৃষকের গোলা খালি।
জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে কেনা ধান হতে হবে উজ্জ্বল বর্ণের, চিটামুক্ত এবং সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা-সম্পন্ন। কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজা ও পানিতে ডুবে থাকা ধানে এসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান দিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে তারা দালাল ও ফড়িয়াদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। সরকার যেখানে প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে এক হাজার ৪৪০ টাকা, সেখানে হাওরের কৃষকেরা পাচ্ছেন মাত্র ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা।
সদর উপজেলার কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে নানা অজুহাতে ফেরত দেয়। পরে সেই ধানই দালালরা কিনে নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। কৃষকের জন্য কোনো সুযোগ নেই।
কৃষকদের অভিযোগ, খাদ্য গুদামকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তারা কৃষকদের সরাসরি ধান বিক্রি করতে বাধা দেয়। পরে কম দামে কৃষকের ধান কিনে নিজেরাই সরকারি গুদামে সরবরাহ করে লাভবান হচ্ছে।
কৃষক সংগঠনের নেতাদের দাবি, কৃষি বিভাগ ও খাদ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, আমরা কৃষি বিভাগের ধান কর্তনের হিসাব প্রত্যাখ্যান করছি। বাস্তবে হাওরের অনেক ধান পানির নিচে রয়েছে। হাওরের এই পরিস্থিতির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড দায়ী। প্রতি বছর তারা দুর্নীতির খেলায় মেতে ওঠে| কুদালের পরিবর্তে কলমে মাটি কাটে, আর কৃষি বিভাগ কাঁচির পরিবর্তে কলমে ধান কাটে। এই দুই বিভাগের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে হাওরের কৃষক।
তিনি আরও বলেন, হাওর রক্ষায় আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন যাবত দাবি করে আসছি হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করার। আশা করি প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয় বর্ধিত করে হাওরবাসীর প্রাণের দাবি হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে এ মহা দুর্যোগের সময় হাওরের কৃষকদের পাশে দাঁড়াবেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এ সংকটের সমাধান হবে না।
এদিকে হাওরাঞ্চলের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ১৪ দফা দাবি তুলে ধরেছে ‘সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান আন্দোলন পরিচালনা কমিটি’।
স্মারকলিপিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন, ঋণ মওকুফ, হাওরের ইজারা বাতিল, ফসল রক্ষা বাঁধে দুর্নীতির বিচার, নদ-নদী ও খাল খনন, কৃষকদের আধুনিক যন্ত্র সরবরাহ, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বৃদ্ধি, খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন এবং ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামে টেকসই বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।
সংগঠনের নেতারা বলেন, প্রতি বছর একইভাবে হাওরের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও টেকসই কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কৃষকরা দিন দিন কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমার ফারুক জানান, আজ ৮ মে পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৮৫ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় ৫৪ দশমিক ২৩ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত জমির পরিমাণ ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর এবং চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১৬ হাজার ৩৯৬ হেক্টর।




