আদালতের ব্যস্ততা ছাপিয়ে সাহিত্যের আলো ছড়াচ্ছেন ছয়েফ উদ্দিন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ মে ২০২৬, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ
আদালতের এজলাসে তখন মানুষের ভিড়, মামলার নথিপত্রের স্তূপ আর আইনি যুক্তিতর্কের টানটান উত্তেজনা। সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী হিসেবে এমন এক তীব্র মানসিক ও শারীরিক ধকলের মধ্য দিয়ে কাটে মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিনের প্রতিদিনের সকাল-সন্ধ্যা। তবে কর্মক্ষেত্রের এই ব্যস্ততা ও নিয়মের বেড়াজাল তাঁর ভেতরের সৃষ্টিশীল সত্ত্বাকে দমাতে পারেনি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে তিনি স্বস্তি খোঁজেন লেখনীর মাঝে, কাগজের বুকে কালির আঁচড়ে। সহজ ভাষায় নিজের দর্শন ও যাপিত জীবনের নানা অধ্যায়কে পাঠকদের সামনে মেলে ধরাই তাঁর পরম আনন্দ।
শিকড় থেকে সৃষ্টিশীলতার বীজ
মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিনের জন্ম সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সুনামপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম হাজী মোহাম্মদ কুটি মিয়া ও মাতা মরহুমা সমিরতা বিবি। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম।
স্কুলজীবন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল প্রবল ঝোঁক। শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর রাখা ছয়েফ উদ্দিন ১৯৮৬ সালে জেলা মেধাভিত্তিক পরীক্ষায় ‘ট্যালেন্টপুল’ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে আল-এমদাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯১ সালে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে একই কলেজ থেকে বি.এসসি (গণিত) এবং ২০০৯ সালে সিলেট ল’ কলেজ থেকে এলএল.বি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৩ সালে শাহানাজ ছয়েফ ডলির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এই লেখকের সংসার জীবন তিন কন্যা ও এক পুত্রকে নিয়ে এক শান্তিময় নীড়।
কর্মব্যস্ততা, ভ্রমণ ও সমাজচিন্তা
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও বর্তমানে তিনি সিলেট আদালতে বিচারিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এই চেনা গণ্ডির বাইরে তাঁর আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি একজন ভ্রমণপিপাসু ও সমাজসেবক। ভ্রমণ ও লেখালেখিকে আত্মার খোরাক বানানো এই লেখক ইতিমধ্যেই ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও কাতারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ চষে বেড়িয়েছেন।
সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সমাজ গঠনে তিনি যুক্ত রয়েছেন নানা সংগঠনের সাথে। তিনি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের (কেমুসাস) জীবন সদস্য, শাহজালাল উপশহর একাডেমির আজীবন দাতা এবং মছলম উদ্দিন খান একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তীক্ষ্ণ আত্মদর্শন ও লেখনীর মুনসিয়ানা
মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন একজন সূক্ষ্ম দ্রষ্টা ও আত্মদর্শনপ্রাণ লেখক। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে তুলতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর ভ্রমণকাহিনীগুলো কেবল পথের বিবরণ নয়, বরং হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উপাখ্যান। কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক হিসেবে ইতিমধ্যেই তাঁর প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থ পাঠক মহলে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এক নজরে লেখকের গ্রন্থপঞ্জি:
প্রথম গ্রন্থ: ‘ভ্রমণ ও দর্শন’ (ভ্রমণ ও আত্মদর্শনের মেলবন্ধন)
দ্বিতীয় গ্রন্থ: ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ (সামাজিক অসঙ্গতি ও উত্তরণের পথ)
তৃতীয় গ্রন্থ: ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ (সমাজ বদলের ইশতেহার)
‘সমকালীন প্রবন্ধ’: সমাজ বদলের ইশতেহার
লেখকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রন্থ ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ মূলত সমকালের এক নিখুঁত দর্পণ। এই গ্রন্থে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা নানা অসংগতি সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রের অরাজকতা, নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজার, খাদ্যে ভেজাল এবং স্বাস্থ্য খাতের বাণিজ্যিকীকরণের নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর লেখনীতে।
বইটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, লেখক কেবল সমস্যার কথা বলেই ক্ষান্ত হননি; প্রথমে সমস্যাকে গভীরভাবে অবলোকন করেছেন, মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন এবং সবশেষে এর থেকে মুক্তির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নৈতিকতার তীব্র স্রোতে গা ভাসানো তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করার বাস্তবসম্মত পন্থাও তিনি বাতলে দিয়েছেন এতে।
শেষ কথা
মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিনের ‘সমকালীন প্রবন্ধ’ গ্রন্থটি পাঠকের দিব্যদৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করবে। একজন পেশাদার ও কর্মব্যস্ত মানুষ হয়েও যেভাবে তিনি ক্লান্তিহীনভাবে সাহিত্যের আঙিনায় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তা এককথায় অনন্য। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে তাঁর এই লেখনীর যাত্রা অব্যাহত থাকুক—এটাই সমকালের প্রত্যাশা।




