ঈদের ছুটিতে পর্যটক বরণে প্রস্তুত সুনামগঞ্জ, আছে দুশ্চিন্তাও
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ মে ২০২৬, ৭:০২ অপরাহ্ণ
টানা এক সপ্তাহের লম্বা ছুটিতে এবার পর্যটকে ভরপুর হওয়ার কথা ছিল সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা। উজান থেকে নেমে আসা নতুন পানিতে ভাসছে পর্যটকবাহী দৃষ্টিনন্দন হাউসবোটগুলোও। আগামী ৩০ ও ৩১ মে—এই দুই দিনের বুকিংও হয়েছিল আশানুরূপ। তবে ‘পাকা ধানে মই’ দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তীব্র যানজট। এই পথের দুর্বিষহ অবস্থায় সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে পর্যটকদের নাভিশ্বাস উঠছে।
পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল সুনামগঞ্জ নয়, সড়কের এই চরম দুর্দশার কারণে শ্রীমঙ্গল থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া—সবখানেই এবার পর্যটকের আগমন কম হতে পারে। সড়কের অসহ্য যন্ত্রণার কথা শুনে অনেকেই ইতিমধ্যে হোটেল, কটেজ এবং হাউসবোটের পুরোনো বুকিং বাতিল করতে শুরু করেছেন; নতুন বুকিংয়ের চাপও বেশ কম। এই অবস্থায় ঈদের ছুটির আগেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক। বর্তমানে এই পথে সাধারণ সময়ের ৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগার নজির প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে।
বস্ত্র প্রকৌশলী স্বজন দেব গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সুনামগঞ্জে আসার জন্য ‘শ্যামলী স্লিপার’ বাসে উঠেছিলেন। তাঁরা সিলেট এসে পৌঁছান পরদিন রোববার বেলা তিনটায়। স্বজন দেব বলেন, ‘সারা পথ মনে হয়েছে বাস যেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণ বাসগুলোর যাত্রীদের ভোগান্তি তো আরও বেশি ছিল।’
শ্যামলী পরিবহনের সুনামগঞ্জের পরিবেশক হোসেন আহমেদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বরোড ও নারায়ণগঞ্জের রূপসীতে পৌঁছানোর আগে চালকেরা রীতিমতো আতঙ্কে থাকেন। কত ঘণ্টায় জ্যাম থেকে বের হওয়া যাবে, তা কেউ বলতে পারে না। এ ছাড়া মাধবপুর-শায়েস্তাগঞ্জেও বিড়ম্বনা হচ্ছে।’
হাউসবোটের ঈদ প্যাকেজ: জেলায় হাউসবোটের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক (অ্যাসোসিয়েশনের আওতাভুক্ত ১০৬টি)। প্রতিজনের জন্য বুকিং মূল্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা (২ দিন ১ রাত)। সুযোগ-সুবিধা: ৬ বেলা খাবার, ৪ বেলা নাস্তা। ভ্রমণ স্পট: টাঙ্গুয়ার ওয়াচ টাওয়ার, টেকেরঘাট, নিলাদ্রি লেক, শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদী ও বারেকের টিলা।
এদিকে দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পটগুলো পর্যটক বরণে পুরোপুরি প্রস্তুত। নতুন পানিতে ভরে ওঠা হাওর, মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ জলরাশি আর খোলা আকাশের মায়াবী পরিবেশ উপভোগ করতে অনেকেই অগ্রিম বুকিং সেরেছেন। তবে সড়ক ভোগান্তির কারণে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ব্যবসায়ীদের।
হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরাফাত হোসেন বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে প্রতিটি হাউসবোট সংস্কার ও রেনোভেশন করা হয়েছে। ৩০ ও ৩১ মে’র বুকিং শেষ পর্যায়ে হলেও ২৮-২৯ মে এবং ১ জুনের পরের তারিখগুলোতে বুকিং অনেক কম। রেল ও বিমানেও টিকিট মিলছে না। সড়কপথে দ্রুত শৃঙ্খলা না ফিরলে পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
একই সুর শোনা গেল সুনামগঞ্জ শহরের ‘হোটেল গ্র্যান্ড’-এর ব্যবস্থাপক অনিশ তালুকদার বাপ্পুর কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা নাস্তার টেবিলে বসেই দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তির কথা বলেন। সড়ক ভোগান্তির কারণে আমাদের হোটেলেই তিনটি বড় দলের (যথাক্রমে ৩০, ৩৫ ও ২০ জন) বুকিং বাতিল হয়েছে।’
অবশ্য এই ভোগান্তির মধ্যেও যাঁরা আগেভাগে পৌঁছাতে পেরেছেন, তাঁরা দারুণ সময় কাটাচ্ছেন। বরিশাল থেকে আসা এক নবদম্পতি বারেকের টিলা থেকে যাদুকাটা নদী ও ভারতের পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে বলেন, ‘সবকিছু মিলিয়ে খুব সুন্দর সময় কাটছে। তবে সড়কের অবস্থা ভালো হলে ভ্রমণটা আরও স্বস্তিদায়ক হতো।’ ঢাকা থেকে আসা আদনান নামের আরেক পর্যটকও সড়কের যানজট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসা মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সপার (ডিএসবি) সুজন সরকার বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রি লেকসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশি টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ভ্রমণকারীরা যাতে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারেন, সে বিষয়ে জেলা পুলিশ সম্পূর্ণ সতর্ক রয়েছে।’




