বর্ষার উচ্ছ্বাসে প্রাণ ফিরে পেয়েছে হাম হাম জলপ্রপাত
মইনুল হাসান আবির:
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জুন ২০২৬, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ
“ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নব যৌবনা বর্ষা, শ্যামল গম্ভীর সরসা…” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চিরায়ত পঙ্ক্তির মতোই আকাশভাঙা বর্ষণের জলধারা যেন নতুন প্রাণস্পন্দন জাগিয়ে তুলেছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা বনবিটের গহীন অরণ্যে।
ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু মুক্তির খোঁজে যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে আসেন, তাদের জন্য বর্ষাকালে এক অনন্য গন্তব্য হয়ে ওঠে হাম হাম জলপ্রপাত। স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষায় ‘হাম হাম’ শব্দের অর্থ প্রবল বেগে পানি পড়ার শব্দ। বর্ষার ভরা মৌসুমে জলপ্রপাতটি যেন তার নামের যথার্থতা প্রমাণ করে অবিরাম গর্জনে।
গহীন অরণ্যে প্রকৃতির বিস্ময়
পাহাড়ের বুক চিরে, সবুজ অরণ্যের দেয়াল ভেদ করে প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ ফুট ওপর থেকে আছড়ে পড়ে স্বচ্ছ জলধারা। নিচে নেমে সেই স্রোত সৃষ্টি করে এক মায়াবী পরিবেশ। শুষ্ক মৌসুমে জলপ্রপাতের প্রবাহ কিছুটা কমে এলেও বর্ষায় তা রূপ নেয় এক প্রমত্তা সুন্দরীতে।
চোখজুড়ানো হাম হাম জলপ্রপাত ইতোমধ্যে কমলগঞ্জের পর্যটন খাতকে নতুন পরিচিতি দিয়েছে। দেশের অন্যতম প্রশস্ত জলপ্রপাত হিসেবে এটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
আবিষ্কারের গল্প
২০১০ সালের শেষ দিকে পর্যটন ইকো-ট্যুর গাইড শ্যামল দেববর্মার নেতৃত্বে একদল রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটক দুর্গম জঙ্গলে প্রবেশ করে প্রথমবারের মতো হাম হাম জলপ্রপাত আবিষ্কার করেন। পরে ২০১১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর উপজেলা প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল জলপ্রপাতটি পরিদর্শন করলে এটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসে।
রোমাঞ্চকর যাত্রাপথ
কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজকান্দি রেঞ্জের চাম্পারায় চা-বাগান এলাকায় অবস্থিত হাম হাম জলপ্রপাত। কুরমা বনবিটের প্রায় ৮ কিলোমিটার গভীরে এবং ভারত সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এর অবস্থান।
কমলগঞ্জ চৌমুহনা থেকে হাইয়েস, জিপ, সিএনজি কিংবা মোটরসাইকেলে চাম্পারায় চা-বাগানের কলাবন বস্তি বা ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী তৈলংবাড়ী পর্যন্ত যাওয়া যায়। এরপর শুরু হয় প্রকৃত ট্র্যাকিং। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু ও পিচ্ছিল পথ ধরে প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছাতে হয় জলপ্রপাতের কাছে।
পথ চলায় অনেকের ভরসা হয়ে ওঠে স্থানীয়ভাবে তৈরি বাঁশের লাঠি।
বন্য প্রকৃতির হাতছানি
যাত্রাপথে অতিক্রম করতে হয় ‘মাকাম’ নামের একটি উঁচু টিলা, যা বর্ষাকালে বেশ পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছে ভরা বনজুড়ে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতির। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ডুমুর, বাঁশ ও বেতবনের ফাঁকে দেখা মিলতে পারে দুর্লভ চশমা বানরেরও।
বনের ভেতরের পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ভেঙে এগোতে হয় পর্যটকদের। জলপ্রপাতের প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকেই কানে ভেসে আসে স্রোতের গর্জন, যা নিমিষেই দূর করে দেয় পথের সব ক্লান্তি।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতা
হাম হাম ভ্রমণে আসা লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির শিক্ষার্থী হেরোলাস, ডিফ্রাংকি, সুহান ও ক্লিনটন বলেন, “আমাদের এলাকার এত সুন্দর একটি জায়গা আছে, তা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতাম। কিন্তু কখনো আসা হয়নি। কলাবন থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে হাম হামে পৌঁছানোর পর সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।”
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক আশফাক করিম বলেন, “হাম হাম দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে কিছুটা কষ্ট করেই এখানে আসতে হয়।”
সতর্কতা ও পরিবেশ সচেতনতা
প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও সচেতন থাকতে হবে। চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, সিগারেটের ফিল্টার কিংবা অন্যান্য বর্জ্য বনের মধ্যে ফেলে না রেখে সঙ্গে করে নিয়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে।
এ ছাড়া পাহাড়ি ও পিচ্ছিল পথে চলাচলের জন্য ভালো গ্রিপযুক্ত ট্র্যাকিং জুতা ব্যবহার করা জরুরি। বর্ষাকালে জোঁকের উপদ্রব থাকায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনেরও পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয়রা।
এম এইচ আ



