তালাক : নিকৃষ্টতম হালাল কাজ
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ জুন ২০২৬, ৬:৪০ অপরাহ্ণ
পুরুষ ও নারীর সুন্দর সম্পর্কের নাম বিয়ে। বিয়ের মাধ্যমে সৌহার্দপূর্ণ দাম্পত্য জীবনে উৎসাহ দেয় ইসলাম। তবে দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যখন ভারসাম্যহীন অবস্থা, পারস্পরিক মনোমালিন্য ও সাংসারিক তিক্ততা দেখা দেয়, তখন একত্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বিয়ের চুক্তির অবসান ঘটানোর সুযোগ ইসলাম রেখেছে। ইসলামে তালাকের ব্যবস্থা রাখা হলেও তালাক প্রদানে কখনোই উৎসাহ দেওয়া হয় না। এটা নিতান্তই নিরুপায় অবস্থা থেকে উত্তরণের একটা অপছন্দনীয় পথ। তালাক মানে বন্ধনমুক্ত করা। পরিভাষায় স্ত্রীকে বিয়ের বন্ধন থেকে মুক্ত করা। বিয়ের বন্ধন ছিন্ন করা সমাজের যেমন কারও কাছে কাম্য না, তেমনি ইসলামেও কাম্য না।
ইসলামে এটাকে বলা হয়েছে ‘সর্বনিকৃষ্ট হালাল’। হজরত মুআররিফ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়ের মধ্যে তালাকের চেয়ে অধিকতর ঘৃণিত আর কিছু নেই’ (আবু দাউদ : ২১৭৭)। আল্লামা তীবি (রহ.) বলেন, তালাক ইসলামে বৈধ হলেও তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, কেননা শয়তানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো। সুতরাং শয়তানের প্রিয় কাজ আল্লাহর কাছে কখনো পছন্দনীয় হতে পারে না।
তালাকের প্রকৃতি ও স্বভাবগত বিধান হলো তা হালাল, কিন্তু ওটাকে যখন পাপের সঙ্গে সংমিশ্রণ করা হয়, তখন তা হয় আল্লাহর কাছে অপ্রিয়। যেমন মানুষ অন্যায় ও অযাচিতভাবে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ফেলে, অসময়ে স্ত্রীকে তালাক দেয়, শরিয়ত সীমালঙ্ঘন করে একই সঙ্গে একাধিক তালাক দিয়ে দেয় ইত্যাদি। তালাক বৈধ হওয়া সত্ত্বেও হারাম ও বেদাত পন্থায় তা প্রয়োগের কারণে তা হয় আল্লাহর কাছে অপ্রিয় ও অপছন্দনীয়। অথবা তালাকের দ্বারা উভয়ে যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি অনেকের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে তখন তা হয় আল্লাহর কাছে অপ্রিয়।
যদি কোনো কারণবশত তালাক দিতেই হয়, তবে ইসলামি শরিয়তের নির্ধারিত নিয়মে তালাক প্রদান করা উত্তম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তাঁর ঋতুবতী স্ত্রীকে তালাক দিলেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ বিষয়ে জিগ্যেস করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাঁকে তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে বলো এবং ‘তুহর’ (পবিত্রতা) পর্যন্ত রেখে দিতে বলো। এরপর আবার হায়েজ ও তার থেকে আবার পাক হওয়ার পর ইচ্ছে করলে সে তাকে রেখে দেবে অন্যথায় সহবাসের আগেই তালাক দেবে (বুখারি : ৫২৫১)। মহান আল্লাহ এভাবে ইদ্দত পালনের সুযোগ রেখে স্ত্রীদের তালাক দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তালাক দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করার শরিয়তসম্মত ব্যবস্থা। এটা কখন ও কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং তা কীভাবে কার্যকর হবে ইসলামে তার সুবিধিবদ্ধ বিধান রয়েছে। স্ত্রীকে ঋতুকালে কখনো তালাক প্রদান করা যাবে না। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুস্রাবের সময় তালাক প্রদান করেছিলেন, যা শরিতসিদ্ধ নয়। নবী (সা.) এ খবর পেয়ে ভীষণভাবে রাগান্বিত হয়ে যান এবং তাঁর তালাক অকার্যকর করে দিয়ে স্ত্রীকে ফেরত আনতে নির্দেশ করেন। অতঃপর তাঁর প্রতি নির্দেশনা প্রদান করেন যে, একান্তই তালাক দেওয়ার প্রয়োজন হলে ঋতুস্রাব অতিবাহিত হয়ে প্রথম পবিত্রকালে তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় পবিত্রকালে তালাক দেবে।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, দ্বিতীয় তুহর বা পরবর্তী পবিত্রকাল পর্যন্ত তালাককে বিলম্বিত করার নির্দেশনার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ হলো, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) স্ত্রীর সঙ্গে মনের দূরত্বের কারণেই তালাক দিয়েছিলেন। আল্লাহর নবী (সা.) তাঁর স্ত্রীকে ফেরত এনে তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিক সংসার জীবনযাপনের দীর্ঘ সুযোগ করে দিয়েছেন। যাতে এই সময়ের মধ্যে তাঁর সঙ্গে দৈহিক মিলন ঘটায়, এতে তার মনের সঞ্চিত রাগ ও ঘৃণা দূর হয়ে যায় যা তালাকের মূল কারণ, এটা নিঃশেষ হয়ে গেলে তালাকের আর প্রয়োজনই যেন না হয় এবং তাকে স্ত্রী হিসেবে রেখে দেয়। মুসলিম উম্মাহ ঋতুস্রাবকালে তালাক প্রদানকে হারাম বলেছেন। এ অবস্থায় তালাক প্রদান করলে গুনাহগার হবে।
তালাক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কেউ এর অপব্যবহার করলে কিংবা ভুল পন্থায় তা প্রয়োগ করলে সে একদিকে যেমন গুনাহগার হবে, অন্যদিকে তালাকও কার্যকর হয়ে যাবে। তাই প্রত্যেক বিবেচক স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব হলো তালাকের শব্দ কিংবা এর সমার্থক কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করা থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিরত থাকা। অতি প্রয়োজন ছাড়া স্বামীর জন্য যেমন তালাক দেওয়া জায়েজ নয়, তেমনি স্ত্রীর জন্যও তালাক চাওয়া নিষিদ্ধ। তালাকের পথ খোলা রাখা হয়েছে শুধু অতি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য।
বিয়ে বিচ্ছেদের প্রভাব যে শুধু নর-নারীর মানসিক অবস্থার ওপরেই পড়ে তা নয়, শারীরিকভাবেও ক্ষতি হয়। বিয়ে বিচ্ছেদের মতো মানসিক ঝড় নর-নারীর জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যাও তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে তাদের সন্তানদের ওপর। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ অনিশ্চিত করে দেয় অনেক ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ। তারা সবসময় এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের কর্তব্য তালাক থেকে দূরে থাকা। তালাক দেওয়ার ক্ষমতা যেহেতু পুরুষের, তাই পুরুষকে ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারে খুবই সংযমী হতে হবে। অন্যদিকে নারীর ব্যাপারেও হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে নারী স্বামীর কাছে বিনা কারণে তালাক প্রার্থনা করে, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ পর্যন্ত হারাম।’ (ইবনে মাজাহ : ২০৫৫)



