দিন-রাতে কাটা হচ্ছে গাছ, সংকটে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ জুন ২০২৬, ৬:৩৫ অপরাহ্ণ
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রামসার সাইট ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধার টাঙ্গুয়ার হাওরে উদ্বেগজনক হারে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগান। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পরিবেশবাদী ও কমিউনিটি নেতারা বলছেন, প্রশাসনের দুর্বল নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাওরের বনাঞ্চল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এতে পাখি, মাছসহ বিভিন্ন জলজ ও স্থলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মেঘালয় পাদদেশীয় এলাকার সংকটাপন্ন জলাভূমি হিসেবে পরিচিত টাঙ্গুয়ার হাওর দীর্ঘদিন ধরে জলজ উদ্ভিদ, মাছ, পাখি ও নানা প্রজাতির প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নির্বিচারে হিজল-করচ গাছ কাটার ফলে এই জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে পাখির সংখ্যা, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে বিভিন্ন প্রাণী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মাছের আশ্রয়স্থল তৈরির নামে এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি চক্র নিয়মিত হিজল-করচ গাছের ডালপালা, কাণ্ড এমনকি গোড়াও কেটে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের অন্ধকারে গাছের গোড়ায় কুড়াল দিয়ে আঘাত করে তা মেরে ফেলা হয়। পরে শুকিয়ে গেলে মৃত গাছের অজুহাতে প্রকাশ্যে কেটে নিয়ে যাওয়া হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় শতাধিক গাছের ডালপালা ধারালো করাত দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি গাছ গোড়া থেকে উপড়ে ফেলারও প্রমাণ মিলেছে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরের বনাঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও ভয়াবহ।
স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, “অনেকে জ্বালানির জন্য গাছ কাটে। কিছু গাছ মরে গেলে মানুষ সেগুলো কেটে নিয়ে যায়। কে কাটে, কে নেয়—এসব তদারকির লোক খুব একটা দেখা যায় না।”
হাওরের কমিউনিটি নেতাদের অভিযোগ, হাওর রক্ষায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা জনবল সংকটের কারণে কার্যকর দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। পাশাপাশি প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ আবুল কালাম বলেন, “আগের তুলনায় হাওরের গাছ ও মাছ দুটোই কমে গেছে। এত বড় হাওর পাহারার জন্য মাত্র তিনটি ক্যাম্প রয়েছে। আগে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ছিল, এখন সেটিও নেই। যথাযথ তদারকি না হলে গাছ ও মাছের সংখ্যা আরও কমে যাবে।”
হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএসের সমন্বয়কারী সাইফুল চৌধুরী বলেন, “বিভিন্ন সময়ে রোপণ করা অনেক হিজল-করচ গাছ এখন ঝুঁকির মুখে। কেউ জ্বালানির জন্য, আবার কেউ মাছের আশ্রয়স্থল তৈরির নামে গাছ কাটছে। এ প্রবণতা কঠোরভাবে দমন না করলে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।”
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে টাঙ্গুয়ার হাওরে নজরদারি বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হিজল-করচ গাছ হাওরের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে গাছ কাটার প্রবণতা বন্ধ হবে এবং সংরক্ষিত হবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমির পরিবেশ।
এম এইচ আ




