সুনামগঞ্জে সরকারি সহায়তার তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন প্রকৃত কৃষকেরা
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মে ২০২৬, ৭:৩৩ অপরাহ্ণ
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন এবার ডুবে গেছে অকাল বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার পানিতে। মাঠজুড়ে কৃষকের দীর্ঘ পরিশ্রম ভেসে গেলেও সরকারি সহায়তার তালিকায় জায়গা মিলছে না অনেক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের। বরং তালিকা তৈরিকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
দেখার হাওর–সংলগ্ন খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন কৃষক আব্দুল্লাহ মুকিত। সাত একর জমিতে বোরো আবাদ করলেও ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় পাঁচ একরের ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বড় পরিবার আর সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর একমাত্র ভরসা ছিল এই ফসল।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “দিনভর ধান শুকানোর চেষ্টা করছি। সরকারি সহায়তার পেছনে দৌড়ানোর সময় কোথায়? যারা চাষাবাদই করে না, তারাও তালিকার জন্য ঘুরছে। অথচ আমার আইডি কার্ড এখনো কেউ নেয়নি। জানি না প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা আমাদের ভাগ্যে আছে কি না।”
শুধু আব্দুল্লাহ মুকিত নন, লক্ষণশ্রী ইউনিয়ন–এর দেখার হাওরের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের অভিযোগ, এখনো তাদের সঙ্গে সহায়তার বিষয়ে কেউ যোগাযোগ করেনি।
জানা গেছে, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ২০ কেজি চাল ও নগদ অর্থ সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এজন্য তালিকা প্রস্তুতের কাজও চলছে। তবে অনেক এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী বা পরিচিতজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় তালিকা পুনরায় যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, যারা প্রকৃত চাষি নন, তারাও তালিকায় নাম তুলতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে অনেক প্রকৃত কৃষক স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
দেখার হাওরের কৃষক শফিক মিয়া বলেন, “হাওরে প্রায় সব কৃষকের ধানের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আইডি কার্ড নেওয়া হচ্ছে শুধু তাদের, যাদের নেতাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে।”
লক্ষণশ্রী ইউনিয়ন পরিষদ–এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন তালুকদার বলেন, “মাত্র দুই দিনের সময় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে বলা হয়েছিল। এজন্য কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। এখন প্রতি ইউনিয়নে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।”
তিনি জানান, কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিএনপির দুই প্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদ–এর চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া বলেন, জেলার মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম শাল্লা উপজেলা–তে বহু কৃষকের ধান নষ্ট হয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে ২৯ সদস্যবিশিষ্ট যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২০ কেজি চাল ও নগদ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ক্যাটাগরি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতারা নিজেদের ঘনিষ্ঠদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেখানোর চেষ্টা করতে পারেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান বলেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে ৯৮ হাজার কৃষকের তালিকা প্রস্তুত হয়েছে, যা এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, তালিকা তৈরিতে কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব বা দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া যাবে না। স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও কৃষি বিভাগকে সরেজমিনে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




