চার বছর বয়সে সিলেট রেলস্টেশনে পাওয়া সেই স্বপ্নার নতুন জীবনের শুরু
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মে ২০২৬, ৭:১৮ অপরাহ্ণ

মাত্র চার বছর বয়স। নিজের নামটুকুও ঠিকমতো বলতে পারত না ছোট্ট মেয়েটি। সিলেট রেলওয়ে স্টেশন–এর ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে একদিন তাকে পাওয়া যায় অসহায়, নিশ্চুপ আর ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায়। কোথা থেকে এসেছে, কার মেয়ে—কেউ জানত না। হারিয়ে যাওয়া সেই শিশুটির চোখজুড়ে ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা আর অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্ক।
সেই ছোট্ট শিশুটির নাম স্বপ্না আক্তার। দীর্ঘ ১৪ বছরের সংগ্রাম, ভালোবাসা আর আশ্রয়ের গল্প পেরিয়ে বুধবার (১৩ মে) দুপুরে সিলেটের শিবগঞ্জ লামাপাড়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন পরিচালিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। যে প্রতিষ্ঠান একদিন তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, আজ সেই প্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠল তার নতুন জীবনের সূচনার সবচেয়ে আপন ঠিকানা।
বিয়ের পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল আবেগ, মমতা আর দায়িত্ববোধের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কোথাও কোনো ঘাটতি ছিল না। সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—সবকিছুই ছিল একটি স্বাভাবিক পরিবারের আদরের মেয়ের বিয়ের মতো। উপস্থিত অনেকের চোখেই তখন চিকচিক করছিল অশ্রু। কারণ, পরিবারহীন এক মেয়েকে ঘিরে এত মানুষের ভালোবাসা সত্যিই ছিল হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্বপ্নাকে উদ্ধারের পর তাকে আশ্রয় দেওয়া হয় সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। ফলে তাকে আর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়, ধীরে ধীরে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়। একসময় সেই ছোট্ট অসহায় মেয়েটিই ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস. এম. মোক্তার হোসেন বলেন, “স্বপ্নার বয়স এখন ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। কোনো অভিভাবক না থাকায় এবং তার সম্মতি নিয়েই আমরা বিয়ের আয়োজন করেছি। আমরা চেয়েছি, তার ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ, সুন্দর আর সম্মানজনক হয়।”
পাত্রও সিলেটেরই সন্তান। তিনি ইলেকট্রিকের ঠিকাদারি কাজ করেন। স্বপ্নার বিয়েকে ঘিরে এগিয়ে আসেন সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা স্বপ্নার নামে এফডিআর করে রাখা হবে। স্থানীয় এক ব্যক্তি উপহার দিয়েছেন প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। পুনর্বাসন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ছিল অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন। এমনকি একটি মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উপহার হিসেবে দেয় ১০০ কাপ দই।
সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন ছিল আনন্দমুখর, আবেগঘন আর হৃদয়স্পর্শী। কেউ বুঝতেই পারেননি, এটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক তরুণীর বিয়ে। বরং মনে হচ্ছিল, বহু আদরে বড় হওয়া কোনো মেয়ের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনটি উদ্যাপন করা হচ্ছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সুচিত্রা রায়, মো. আব্দুর রফিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “আমার খুবই ভালো লেগেছে। সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু একটি পিতৃমাতৃহীন শিশুকে আশ্রয়ই দেয়নি, তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে জীবন গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ তাকে বিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের ভিত্তিও তৈরি করে দিল।”
তিনি নবদম্পতির সুখী ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা করেন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত, পথশিশু, ঝুঁকিতে থাকা ও পিতৃহীন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, ভরণপোষণ এবং পুনর্বাসন সেবা দিয়ে আসছে। স্বপ্না আক্তারের গল্প যেন সেই মানবিক উদ্যোগেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যেখানে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর জীবন নতুন করে খুঁজে পেয়েছে স্বপ্ন, ভালোবাসা আর আপন ঠিকানা।




