সুনামগঞ্জ শহরে চারলেন প্রকল্প, ধীরগতির কারণেই জনদুর্ভোগ
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুন ২০২৬, ১০:১১ অপরাহ্ণ

বৃষ্টি হলেই সুনামগঞ্জ পৌর শহরের চার কিলোমিটার ফোরলেন চলমান সড়কের চিত্র বদলে নরকযন্ত্রণায় পরিণত হয়। বেশিরভাগ সড়কের বড় বড় গর্তে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তীব্র যানজট, খানাখন্দে দুর্ঘটনা এবং পথচারীদের চরম ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্র। বন বিভাগের গাছ অপসারণ ও বিদ্যুৎ বিভাগের খুঁটি স্থানান্তরিত না করায় ফোরলেনের কাজে দেখা দিয়েছে চরম ধীরগতি। আর এই ত্রিমুখী সমন্বয়হীনতার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
সড়কটির কাজের শুরু থেকেই ধীরগতির কারণ হিসেবে সড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বন বিভাগের দায়িত্বশীলদের মধ্যে কেবলই ‘রশি টানাটানি’র গল্প শুনতে হচ্ছে জনগণকে। সড়ক বিভাগ বলছে, খুঁটি ও গাছ না সরানোর কারণে দ্রুত কাজ করা যাচ্ছে না। অপরদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ একটার পর একটা অজুহাত সামনে এনে কাজে বিলম্ব করছে। এমন সমন্বয়হীনতার গল্পের মাঝে ভুক্তভোগীদের দাবি— ফোরলেনের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার পাশাপাশি চলমান ভোগান্তির দ্রুত টেকসই সমাধান করা হোক।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ শহরের ওয়েজখালী বাজার, মল্লিকপুর এলাকার সিনতিয়া পেট্রোল পাম্পের সামনের সড়ক এবং পুরাতন বাস স্টেশন এলাকাসহ সড়কের অধিকাংশ জায়গায় গাড়ি চালক, যাত্রী এবং পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কাদা—জল আর গর্তের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট—বড় দুর্ঘটনা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন এই চার কিলোমিটার ফোরলেনের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘জনজেবি’ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। ১৫০ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয়ের এই কাজটি ২০২৫ সালের শেষের দিকে শুরু হয়, যা ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। তবে কাজের বর্তমান কচ্ছপগতির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না— এ নিয়ে জনমনে তীব্র সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সড়কের এই বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় চালক ও বাসিন্দারা। এদিকে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথটির ফোরলেনের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কার্যকর সমন্বয় ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন জেলাবাসী।
সিএনজি চালক সাইদুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিদিনই এই সড়কে গাড়ি চালাই। বৃষ্টি হলেই গর্তগুলো পানিতে ডুবে যায়, বোঝাই যায় না কোথায় গর্ত। গাড়ির ঝাঁকুনিতে যাত্রীরা কষ্ট পান, আমাদের গাড়ির চাকাও নষ্ট হয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে আমরা এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। ঢিলেঢালা কাজ না করে আগে চলাচলের রাস্তা ঠিক করা উচিত।
রিকশা চালক সুলতান মিয়া বলেন, কষ্টের কথা আর কইবার মতো না, সড়কের সবখানেই গর্ত, রিকশার চাকা সোজা রাখা যায় না। একদিকে যেতে চাইলে গর্তে পড়ে রিকশা অন্যদিকে চলে যায়। মাঝেমধ্যেই গাড়ি গর্তে দেবে যায়। গর্তগুলো অন্তত ভরাট করে দিলেও আমাদের একটু উপকার হতো।
সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া এলাকা থেকে ঠেলাগাড়িতে মালামাল নিয়ে শহরে যাওয়ার পথে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঠেলাগাড়ি চালক আমির হোসেন বলেন, এই রাস্তায় ঠেলাগাড়ি টানা যে কত কষ্টের, তা কেবল আমরাই জানি। এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে আমাদের জানে ধরে (প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়)। সড়কটি দ্রুত ঠিক করা আমাদের জন্য জরুরি।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জনজেবির ঠিকাদার গোলাম আজম বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট ও শ্রমিক থাকা সত্ত্বেও আমরা কাজ করতে পারছি না। বিদ্যুৎ বিভাগের খুঁটি এবং বন বিভাগের গাছের গুঁড়ি না সরানোর কারণে কাজে বিঘ্ন ঘটছে। আমাদের শ্রমিকদের বেকার বসে থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ চাইলেই ওয়েজখালী অংশের দুই পাশের খুঁটি স্থানান্তর করতে পারে, কিন্তু তারা করছে না। তবে জনভোগান্তির কথা বিবেচনা করে তিনি আশ্বাস দেন, আগামীকালই সড়কের যে যে অংশে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো ভরাট করে চলাচলের উপযোগী করে দেবো।
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার আনিসুর রহমান জানান, সড়কের গাছের গুঁড়ি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ঠিকাদারকে নির্দেশ দেবেন।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল আহমেদ ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ঈদের ছুটির পর ঠিকাদার কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে এবং কাজের লোকজন চলে যাওয়ায় সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত কাজ শুরু করার জন্য আমি ঠিকাদারকে সতর্ক করেছি। আমরা এ বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর আছি।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ্ বলেন,‘আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। একমুখী সড়ক, বিকল্প কোন সড়কও নেই। মানুষের কষ্ট হচ্ছে বুঝতেছি আমরা। কাজটি দ্রুত শেষ করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
- নীরব চাকলাদার



