হবিগঞ্জে নিষিদ্ধ জালের দৌরাত্ম্যে ধ্বংস জীববৈচিত্র্য, মাছশূন্য জলাশয়
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ জুন ২০২৬, ৭:৫২ অপরাহ্ণ
হবিগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওর, নদী, খাল ও বিলগুলো একসময় দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, রিং জাল ও চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহারে সেই সমৃদ্ধ জলাশয়গুলো এখন মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। শোল, গজার, টেংরা, পাবদা, কৈ, বোয়াল, আইড়, মাগুর, সিংসহ নানা প্রজাতির সুস্বাদু দেশীয় মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই নিষিদ্ধ জালগুলো শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এমনকি মাছের ডিম পর্যন্ত নির্বিচারে ধ্বংস করছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং হাওরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে।
বানিয়াচং, লাখাই, চুনারুঘাট, মাধবপুর, নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জসহ জেলার প্রায় সবকটি উপজেলার হাওরাঞ্চলে এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। নলাই হাওর, প্রতাপপুর হাওর, ভবানীপুর হাওর, কালিয়ারগাঁও হাওর, সুমাই হাওর, খোয়াই নদী, কুশিয়ারা নদী, সুনাই নদীসহ ছোট-বড় সব জলাশয়েই একই চিত্র।
স্থানীয় জেলে আব্দুল মিয়া (৫৫) বলেন, “আগে বর্ষাকালে হাওরে জাল ফেললে এক টানে শোল-গজার, পাবদা-কৈ উঠতো ভর্তি। এখন কারেন্ট জালের ঝড়ে সবকিছু শেষ। পোনা-ডিম কিছুই বাঁচছে না। আমাদের জীবিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
আরেক জেলে রহমত আলী (৪৮) জানান, “রাতের আঁধারে অসাধু কিছু লোক নিষিদ্ধ জাল ফেলে মাছ নিধন চালায়। প্রশাসনের নজরদারি খুব কম। ফলে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একসময় এখানকার হাওরে মাছ ধরে আমরা সংসার চালাতাম, এখন অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার শুধু মাছের সংখ্যা কমাচ্ছে না, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। হাওরের পানি, উদ্ভিদ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা। কিন্তু অবৈধ জালের কারণে দেশীয় মাছের উৎপাদন বছরের পর বছর কমছে। এতে স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জেলেদের জীবিকা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও মৎস্য বিভাগের কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান চোখে পড়ছে না। ফলে অবৈধ জাল ব্যবহারকারীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বানিয়াচং উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, “হাওরে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রতাপপুর ও ভবানীপুর হাওর এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। অবৈধ জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, মাছের প্রজনন ও হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, হবিগঞ্জের সব উপজেলায়ই সমস্যাটি চিহ্নিত হয়েছে। জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা চ্যালেঞ্জিং, তবে চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী, জেলে সমিতি ও সচেতন নাগরিকরা দাবি করেছেন, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, রিং জাল ও অন্যান্য অবৈধ জালের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে দেশীয় মাছ সংরক্ষণে মৎস্য অভয়াশ্রম বাড়ানো, জেলেদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা, নিয়মিত মনিটরিং এবং সচেতনতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
হাওরের মাছ শুধু জেলেদের জীবিকার উৎস নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে হবিগঞ্জের হাওর-নদীর চিরায়ত জীববৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।
স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের দ্রুত ও জোরালো পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
- নীরব চাকলাদার



