চীনের নদী প্রকল্পে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুন ২০২৬, ৩:৫৭ অপরাহ্ণ
২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ ও চীন যখন ইয়ারলুং সাংপো-যমুনা নদী ব্যবস্থার জলবিদ্যাগত তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সই করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এটিকে বন্যা পূর্বাভাস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পানি সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে এই সহযোগিতার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে- চীনের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়তে থাকলে নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ কি বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?
চীনের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের কারণে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মতো বিভিন্ন পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনা কোম্পানি পাওয়ারচায়না তাদের সমঝোতা স্মারক নবায়ন করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানিটি ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রকল্পের ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) তৈরি করবে এবং ২০২৬ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করবে।
প্রকল্পের আওতায় রয়েছে বড় পরিসরে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, জলাধার তৈরি, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ এবং একটি আধুনিক জলবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রকল্পের সমর্থকদের মতে, এটি উত্তরাঞ্চলের বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনার বড় অংশ চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় ৫০ বছরের পরিকল্পনা
তিস্তা প্রকল্প আসলে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে আরও বৃহৎ সহযোগিতার একটি অংশ।
২০২৫ সালের মার্চে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ তার নদী ব্যবস্থাপনার জন্য ৫০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরিতে চীনের সহায়তা চেয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা আগামী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ এবং পানি বণ্টন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করবে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি এই পরিকল্পনার কাঠামো, জলবিদ্যাগত মডেল, পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি মূলত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিরক্ষা খাত থেকে পাওয়া শিক্ষা
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ভরতার প্রশ্ন নতুন নয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে চীন থেকে কেনা ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ ও বিমানসহ সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, একই ধরনের পরিস্থিতি বেসামরিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও দেখা দিতে পারে, যদি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো বিশেষ প্রযুক্তি, বিশেষায়িত সফটওয়্যার এবং নির্দিষ্ট কোম্পানির রক্ষণাবেক্ষণ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়।
নদী ব্যবস্থাপনায় এর মধ্যে থাকতে পারে পর্যবেক্ষণ সেন্সর, বন্যা পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্ম, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক, যেগুলোর জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সমালোচনা
তিস্তা প্রকল্পটি স্বচ্ছতার অভাবের কারণেও সমালোচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের কিছু বিশ্লেষকের দাবি, প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত বিবরণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি।
সমালোচকদের মতে, তথ্যের এই ঘাটতির কারণে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত নির্ভরতার মাত্রা মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কেন ভারত উদ্বিগ্ন
তিস্তা নদী ভারতের সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এই কারণে তিস্তা অববাহিকায় চীনের কার্যক্রম নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক। বিশেষ করে ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলের কাছে হওয়ায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল।
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চীনা কোম্পানির পরিচালিত জলবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ওই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও নদীসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মূল প্রশ্ন
চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় মালিকানা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ।
বিদেশি কোম্পানির তৈরি অবকাঠামো সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের মালিকানায় থাকে। কিন্তু যখন রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার হালনাগাদ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পুরো ব্যবস্থার পরিচালনা বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তাই নদী অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
অন্যদিকে, ভারতের জন্যও এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় শুধু কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিকল্পও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
- নীরব চাকলাদার



