ছোটগল্প: স্বস্তির নিঃশ্বাস

সুলেখা আক্তার শান্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ অক্টোবর ২০২৪, ৫:২৪ অপরাহ্ণআজানের কিছু পর ভোরের সূর্য ওঠার আগে আকাশ লাল হতে শুরু করে। টুটুলের ঘুম ভেঙে যায়। বিছানা থেকে চট করে উঠে পড়ে। চোখ কচলে বরই তলায় যায়। গাছের নিচে অনেক বরই পড়ে থাকে। আধো আঁধারে টসটসে বরই গুলো চকচক করে। সে বরই কুড়িয়ে ঝুড়িতে রাখে। কিছু ফল পরিপক্ক হলে আপনি ঝরে পড়ে। কিছু পড়ে পাখির ডানা ঝাপটায়। সকাল ভোরে ফুল ফল কুড়ানোর আকর্ষণ আলাদা যেন আবিষ্কারের আনন্দ পাওয়া যায়।
দাদি নুরজাহান ঘুম চোখে এপাশ-ওপাশ করে। হাত বাড়িয়ে নাতির খোঁজ করে প্রতিদিনের মতো। না পেয়ে বুঝতে পারে নাতি বাগানে গেছে। গিয়ে দেখে বাগানে টুটুলের ব্যস্ততা। দাদি দেখো বরই ভালোই পড়ছে। আমি সব সাজিতে তুলছি। দাদাভাই একটু বেলা হলে আরো কিছু বরই পাইরা হাটে নিয়ে যাবো, দাদি বলে। বরই বেইচা কিছু বাজার সদাই নিয়ে আসব। কাজ শেষ হলে কাঁটাযুক্ত বাবলা গাছের ডাল বরই গাছের গোড়ায় বেঁধে দেওয়া হয়। কেউ যেন গাছে না উঠতে পারে। দাদি বলে, দাদাভাই তুমি বাড়িতে থাকো। বরই গাছ পাহারা দাও। দেখবা কেউ বরই না পারে। টুটুল বলে, ঠিক আছে দাদি তুমি হাটে যাও। আমার জন্য খাওয়ানোর জিনিস নিয়া আইসো। দাদি বলে, তোমার জন্য তো কত কিছু আনতে মন চায়। টাকায় কতটুকু কুলায় দেখি। তুমি কোথায় যাইওনা বড়ই গাছের দিকে খেয়াল রাখবা। টুটুল বলে, আচ্ছা দাদি।
নুরজাহানের বাগানের রসালো বরই খুবই স্বাদের। কেউ একবার খেলে আবার খেতে চায়। আশেপাশের অনেকেই নুরজাহানের বরই কিনে নিয়ে যায়। নুরজাহান হাট থেকে ফিরে টুটুলের খোঁজ করে। টুটুল বাগানে নাই। বরই গাছের দিকে তাকিয়ে দেখে যেমন রেখে গেছিল তেমন নাই। নুরজাহান অস্থির হয়ে পড়ে। চিল্লাইয়া বাড়ি মাথায় তুলে। সবাই জড়ো হয়ে কী হয়েছে জানতে চায়। টুটুলও আসে। নুরজাহান নাতিকে জিজ্ঞেস করে তুই কোথায় গেছিলি? টুটুল বলে, আমি খেলতে গিয়েছিলাম। নুরজাহান বুঝতে পারে দুষ্টু পোলাপান কাজ। নাতিকে খেলার উসিলায় বাড়ি খালি কইরা বরই পাইরা নিয়া গেছে।
অনেকে বলে, পোলাপান বোঝে না, না বুঝেই কয়টা বরই নিছে এতে কী এমন ক্ষতি হইছে?
দুই চারটা ফলের গাছ আছে তাই দিয়া চলি। এমন করলে কিভাবে চলবো!
কী করবা যে গেছে ফল আছে সেই গাছে ঢিল মারে।
হইছে কারো কিছু বলতে হইবো না। আমাগো ভালো কারো সহ্য হইতাছে না। মনে হয় সবাই শত্রুতা করতে আছে।
টুটুল বায়না ধরে, দাদি তুমি হাটে গেলে আমারে নিয়ে যাবা। নুরজাহান বলে, দাদাভাই তুমি আমার সঙ্গে গেলে বাড়ি তো খালি থাকবো। গাছের ফল ফলাদি তো একটাও থাকবো না। টুটুল বলে, তুমি ভালো করে গাছের গোড়ায় কাটা দাও যাতে কেউ গাছে উঠতে না পারে। দাদি বলে, গাছে কাটাতো দেই। তারপরও মানুষের নজর গাছের ফলের দিকে। কেউ বুঝতে চায় না এই দিয়া আমরা চলি। গাছের নিচে ভালোভাবে কাঁটা বেঁধে রেখে নাতিকে নিয়ে হাটে যায়। বরই বিক্রি করে বাজার সদাই করে, নাতিকে পছন্দের খাবার কিনে দেয়। খুশি মনে তারা বাড়ি ফিরে। বাড়িতে বাগানে গিয়ে দেখে সর্বনাশ হয়েছে। বরই গাছের সব বরই ঝেড়ে মুছে কারা যেন পেড়ে নিয়ে গেছে। নুরজাহান নাতিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এখন আমাদের কী হবে? কেমন করে চলবো আমরা। রাগে ক্ষোভে উন্মত্ত হলে মানুষ নিজের সর্বনাশ করে। নুরজাহানের মাথা ঠিক থাকে না। ঘরের থেকে কুড়াল এনে গাছ কেটে ফেলতে উদ্যত হয়। টুটুল দাদির হাত থেকে কুড়াল টেনে নিয়ে শান্ত করতে চেষ্টা করে। বলে, দাদি গাছ কেটো না। গাছ কাটলে আমরা খাব কী? এবার না হলো আবার তো ফল হবে। টুটুল দাদির চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। দাদিকে সান্তনা দেয়, তোমার সাথে কোথাও আর যাইতে চাবো না। তুমি কোথায় গেলে আমি বাগানে বসে থাকবো। গাছের যত্ন নেব গাছ পাহারা দিব। নুরজাহান শান্ত হয়ে নাতিকে আদর করে, ঠিক আছে দাদাভাই। ভবিষ্যৎ কান্ডারীর দৃঢ় মনোবল দেখে নুরজাহান আশ্বস্ত হয়, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
সাহিত্য/হা