ছোটগল্প: বিষাদ প্রেমের সুর

সুলেখা আক্তার শান্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জুন ২০২৩, ১:১৬ পূর্বাহ্ণ
আমার এই মেয়েটা খুব লক্ষী। কোন সময় কোন কিছু বলে কয়ে করাতে হয়না। নিজের উদ্যোগেই সবকিছু করে। ঘরের কাজ, ভাই বোনের পড়ালেখা, ওদের সাজসজ্জা আবার নিজের পড়ালেখা। এনার ফুপু সাবিনা বলেন, মেয়েকে কত করে বললাম আমার বাড়ি দুইটা দিন বেরিয়ে আসিস, তা গেল না, আজকালকার ছেলে মেয়েদের চলন বলন যেমন, সেদিকে এনা অনেক ভালো। কোন আড্ডা, গল্পগুজব সেই দিকে তোমার মেয়ে নাই। এনা মা, মা বলে ডাকতে, ডাকতে মায়ের কাছে আসে, মা আমি কলেজে গেলাম। কলেজে যাবি কিন্তু টাকা নিয়ে যাবি না। এই নে গাড়ি ভাড়া। লাগবে না আমার কাছে আছে। এনা হেঁটেই বেশি ভাগ কলেজে যায় কখনো বা গাড়িতে যায়। মা যে টাকা দেয় খরচের জন্য সে টাকা খরচ না করে জমিয়ে রাখে। সেই টাকা দিয়ে কখনো ভাই বোনের জন্য এটা ওটা কিনে দেয়। একদিন এনা লক্ষ্য করে, প্রায়ই তার পিছনে পিছনে কেউ হাঁটে কিন্তু তাকালে কাউকে দেখতে পায় না। একদিন দৃষ্টি এড়ায় না ঠিকই চোখে পড়ে যায়। এই যে আপনি আমাকে ফলো করেন? আমি ফিরে তাকালেই আড়ালে চলে যান। কেন যান? ভয়ে চলে যাই। ভয় যখন পান তখন আবার আমাকে লক্ষ্য করেন কেন? মন যে মানে না, মন যে শুধুই তোমাকে দেখতে চায়। তাহলে এই মনটাকে কি করা উচিৎ? আপন করা উচিত? আমি চাই আপনি আমার পথে আর বাধা হয়ে না দাঁড়ান। তাহানের মুখটা মলিন হয়ে যায়। এনা বারণ করলেও তাহান শোনে না। সে প্রতিদিনই এনাকে অনুসরণ করে। একই পথে একই মানুষ রোজ রোজ তাকে একই অনুসরণ, এটা কি ভালো? ভালো কিনা জানিনা। সূর্য যদি প্রতিদিন না উঠে মানুষ নিস্তেজ হয়ে যাবে। আমিও তেমন হয়ে যাব প্রতিদিন তোমার দেখা না পেলে। এনা এই কথা শুনে হেসে দেয়। তাহান হুররে বলে এক লাফ দেয়। এনা অবাক হয়ে বলে, এটা কি হচ্ছে, এত আনন্দ কিসের? তোমার এই হাসিতে বলে দিচ্ছে, তুমি আমার হবে। এনাও আস্তে আস্তে তাহানের প্রতি দুর্বল হতে থাকে। হয়ে যায় দু’জনের ভালোবাসা।
কলেজ আর বাড়ি মোটরসাইকেলে করে এনাকে দিয়ে আসে নিয়ে আসে তাহান। একদিন বিষয়টি চোখে পড়ে তাহানের বাবার। সে বিষয়টি ছেলের কাছে জানতে চায়। সাইফুল হোসেন খুব রাগী মানুষ। ছেলেকে ধমকের কন্ঠে বলেন, আর জানি এরকম মোটরসাইকেলে কাউকে না উঠানো হয়। সে খোঁজ করে মেয়েটি কে। খোঁজ পেয়ে সব তথ্য পেয়ে এনাদের বাড়ি যান। এনার মাকে পেয়ে বলেন, আপনি তো এনার মা? আপনি কে আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না! বিধবা মহিলা হয়ে এত খোঁজ খবর রাখা ভালো না! আর আমার ব্যাপারে জানলেই বা কি হবে?
আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? আর সংযত ভাষায় কথা বলেন।
বিধবা হলে কি হবে স্বপ্ন তো খুব বড়!
আপনি কি বলছেন এসব?
ধনীর দুলালের পিছে মেয়ে লেলিয়ে দেওয়া এটাতো পুরনো পদ্ধতি। আর এদিকে এমন ভাব ধরেছে যেন কিছুই জানে না।
আপনি কি বলতে চান, কথা খুলে বলেন। তোমার মেয়ে আমার ছেলের পিছে লেগেছে, তাকে আমার ছেলের পিছু ছাড়তে বলো। না হয় পরিণতি ভালো হবে না। আমার মেয়ে আপনার ছেলের পিছনে লাগছে। আপনি উল্টা কথা বলছেন। আপনার ছেলেই আমার মেয়ের পিছনে লেগেছে। তাহানের বাবা সংযত স্বর বলেন, বাহ কথা তো ভালোই বলো। শোনো আমি যা বলি তোমার মেয়েকে থামাও। না হয় সন্তান বুকে নিয়ে ঘুমাতে পারবা না। আমি চলি কথাটা যেন মনে থাকে। একটু পরেই মোটরসাইকেলের আওয়াজ। রেহেনা গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে তার মেয়ে একটি ছেলের মোটরসাইকেল থেকে নামছে। অমনি তার গায়ে আগুন ধরে যায়। মেয়ে গেট দিয়ে ঢুকতেই বলেন, কলেজে পড়ালেখার জন্য যাস নাকি রং তামাশা করতে যাস? মা তুমি এভাবে কথা বলছ কেন? বাড়িতে এসে ছেলের বাবা শাসিয়ে যায়। সেই সঙ্গে আমাকে বিধবা বলে অপমানও করে যায়। এনা বিষয়টি তাহানকে জানাতে ফোন করে। কিন্তু ফোন রিসিভ হয়না। কি ব্যাপার ফোন রিসিভ করছে না। কয়েকদিন হয়ে যায়। কলেজে যাওয়া আসার পথেও তাহানের দেখা পায় না। ভেঙ্গে পরে এনা। তাহান কোথায় গেল কি হলো! সম্ভাব্য সব জায়গায় তাহানের খোঁজ করে এনা। কোথাও তাহানের কোন খোঁজ পায় না। অগত্যা খোঁজ নিতে তাহানদের বাড়িতে যায় এনা। কিন্তু তাহানের বাবা সাইফুল হোসেন ছেলের খোঁজ তো দেয়ই না বরং এনাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
এনা উদ্বিগ্ন, অপেক্ষা তাহানের জন্য। সে কোথায় আছে কেমন আছে জানতে পারে না। এনা শুধু কান্নাকাটি করে। মা রেহেনা মেয়েকে বুঝায়। এনা ইন্টার পাশ করে। রেহেনা মেয়ের বিয়ে দিতে চায় কিন্তু এনা বিয়ে করতে চায় না। সে নিজেকে একা করে রাখবে। সে পড়ালেখা করতে চায়। বছর দেড় হয় তার তাহানের সঙ্গে দেখা হয় না।
এনা ঢাকা ভার্সিটি ভর্তি হয়। সেখানে তার খালার বাসায় থাকে। যেখানেই যাক যত দূরেই যাক সে তাহানকে ভুলতে পারে না। তাহানের কথাই শুধু মনে পড়ে। ভার্সিটিতে তার রিপার সাথে পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তারা দু’জন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হয়ে যায়। কিন্তু এনা মুসলিম আর রিপা হিন্দু। দু’জনের ধর্ম দুই হলেও দু’জনের মতামতে কোন অমিলের নেই। একদিন রিপাকে ভার্সিটিতে একটি ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে বসা দেখতে পায়। এনা কাছে এসে অপ্রস্তুত হয়ে কোন কিছু জিজ্ঞেস না করেই চলে যেতে উদ্ধত হয়। রিপা ডাক দেয় এনাকে, পরিচয় করিয়ে দেয়, এনা এই হচ্ছে আমার ভালোবাসার মানুষ পাবেল। পাবেল ও হচ্ছে আমার বান্ধবী এনা। মাশাল্লাহ, তুই যেমন সুন্দর তোর ভালোবাসার মানুষও তেমনি হ্যান্ডসাম। এনার মনে পড়ে তাহানের স্মৃতি। তাহানের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক না থাকলেও অল্প সময়ে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসে ছিল তাহানকে। তাহানের সঙ্গে তার রিলেশন ছিল ৬ মাস মাত্র। সেই রিলেশনেই তাহান তার আগামী পথও হৃদয় জুড়ে থাকবে।
একদিন এনা আর রিপা ক্লাসরুমে হঠাৎ রিপার বই থেকে একটি ছবি পড়ে যায়। ছবিটি তুলে ঠিক করে রাখতেই এনা চমকে উঠে। দু’চোখে তার অশ্রু ঝরতে থাকে। চোখের অশ্রু আড়াল করে এনা জিজ্ঞেস করে, ছবিটির মানুষটি কে? রিপা বলে, আমার স্বামী!
তোর স্বামী!
হ্যাঁ।
তাহলে পাবেল?
পাবেল হবে আমার জীবনসঙ্গী। তাহান নয়। ও তোকে তো বলাই হয়নি। তাহানের সঙ্গে আমার রিলেশন করে বিয়ে হয়। ধর্ম আমাদের দু’জনের জীবনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়। আমি আর তাহান দু’জনে দু’জনকে ভালোবেসে বিয়ে করি। কিন্তু আমার পরিবার কিছুতেই তাহানকে মেনে নেয় না। তাদের কথা আমি যদি একটি গরিব ছেলেকেও ভালোবেসে বিয়ে করতাম তাহলে তাদের সমস্যা ছিল না! যদি সে আমাদের ধর্মের হতো। পরিবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যদি আমি তাকে নিয়ে সংসার করি তাহলে তারা আমাকে ত্যাজ্য করবে।
যে দিনকাল পড়েছে কারো প্রতি তো ভরসা করা যায় না। পরিবার ছেড়ে যদি তাহানকে নিয়ে থাকি আর যদি কখনো তাহান আমাকে ফেলে দেয় তখন কি করব? তাই মনে করলাম পরিবারের কথাই শোনা ভালো। এদিকে আমিও আমার নিজ ধর্মের মানুষ পেয়েছি। দু’জন দু’জনকে ভালোবাসি। এখন আমি তাহানকে ডিভোর্স লেটার পাঠাবো। এনা কি বলবে বুঝতে পারে না! অলক্ষে তার হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। তাহান তাকে ভালবেসে তার পাশে দাঁড়ায় নাই। অথচ অন্য ধর্মের মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে! আজ তাহান নয় তাহানের ভালোবাসার মানুষ তাকে ডিভোর্স দিবে। একজনের স্ত্রী থাকাকালীন অন্য ছেলের সাথে রিলেশন! আর এই তাহানকে মন প্রাণ দিয়ে ভালবেসে এখনো সে তারই অপেক্ষায় রয়েছে। না আর তাহানের জন্য নয়, আজ থেকে তাহানকে হৃদয় থেকে ঝেড়ে ফেললাম।
তাহানকে ডিভোর্স লেটার পাঠায় রিপা। সে এখন পাবেলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রিপা আর পাবেল তাদের দু’জনেরই সচেষ্ট। ডিভোর্স লেটার নিয়ে হাজির হয় তাহান। তাহান আর রিপা দু’জন দু’জনের সম্মুখীন। তুমি আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছ? হ্যাঁ, না পাঠালে কি গেছে তোমার কাছে ডিভোর্স লেটার?
তুমি আমি ভালোবেসে বিয়ে করছি। তাহলে ডিভোর্স লেটার কেন?
আমি তোমার জন্য আমার পরিবার ছাড়তে পারবো না। যেখানে আমার পরিবার রাজি না সেখানে আমিও রাজি না।
আগে তোমার পরিবারের কথা মনে ছিল না?
ছিল না দেখেই তো ভুলটা করেছি।
তুমি আমাকে ভালোবেসে ভুল করেছো?
হ্যাঁ। আর শোনো এখন আমি বিয়ে করবো পাবেলকে।
মানুষ গায়ের জামা কাপড় পুরাতন হলে যেমন ফেলে দেয়। তুমি দেখছি মানুষ পুরাতন হলে তেমন ফেলে দাও, জামা কাপড়ের মতো!
বাজে কথা বোলো না। এটা আমার ভার্সিটি এখানে কথা না বাড়ানোই ভালো।
রিপা তুমি এই ডিভোর্স লেটার তুলে নাও। না যেটা হয়েছে সেটা তুলে নেওয়ার জন্য হয়নি। এখন তুমি তোমার পথ দেখতে পারো। তাহানের চোখে নিরব অশ্রু। কেউ কাউকে কাঁদালে তার নিজেকেও কাঁদতে হয়। তাহানকে দেখতে পেয়ে এনা চলে যেতে নেয়। তাহান অনুরোধ করে, এনা চলে যেও না। এনা পিছন ফিরে দাঁড়ায়। এনা তোমাকে কাঁদিয়েছি আজ আমি নিজেও কাঁদছি। কাউকে কাঁদালে নিজেকেও যে কাঁদতে হবে। এটা হয়তো সৃষ্টিকর্তার লিখন। এনা তোমাকে আমি ফিরে পেতে চাই। তুমি আমাকে ফিরে পেতে চাইলেও আমি তো তোমাকে ফিরে পেতে চাই না। যে আমার চোখের আড়াল হয়েছিল সে এখন আমার মনের আড়াল। একদিন তোমার আলো উজ্জ্বল পথে আমাকে প্রয়োজন মনে করনি।
আজ তোমার আঁধার পথে আমাকে চাও? তোমার জন্য আমার উজ্জ্বল পথও আঁধার হয়েছিল। যেদিন থেকে তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে। আমার খোঁজ করনি। কিন্তু আমি না হারিয়েও তোমার খোঁজ করেছি। এখন আমাদের দু’জনের পথ এক নয়।
তাই দু’জন দুদিকেই চলে যাওয়া ভালো। দু’জন দু’দিকে চলে যায়। তাহান বারবার তাকায় এনার গমন পথের দিকে। এনা পেছন ফিরে তাকায় না একবারও।
সাহিত্য/হান্নান