মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি বাংলাদেশে
সিকডে
প্রকাশিত হয়েছে : 29 August 2026, 6:13 PM
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র গ্যাসসংকট ও সার উৎপাদনে স্থবিরতায় চাপ বাড়ছে শিল্প ও কৃষি খাতে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন নাজুক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত ও সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যেই নতুন এই ধাক্কা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, চলমান পরিস্থিতিতে তা অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। তবে দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বা সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ সরাসরি এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিতে ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, চলতি বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভূমিকা থাকবে অন্তত ১০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় একসঙ্গে বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পণ্যের দাম ও সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায়।
গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে সার উৎপাদনেও। দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের কৃষিভিত্তিক পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ চাপে পড়তে পারে।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধিতে স্বাস্থ্য খাতেও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল ও চিকিৎসাসামগ্রী আমদানিতে জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ওষুধশিল্পও চাপের মধ্যে রয়েছে।
সরকারের ওপরও বাড়ছে ভর্তুকির চাপ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু জ্বালানি খাতেই সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিমাণ ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তাঁর মতে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জটিল অর্থনৈতিক সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়; এ জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন।
তবে বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর মতে, শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকা এবং কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবরই সংকটের গভীরতা তুলে ধরছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম, শিল্পের উৎপাদন, কৃষির উপকরণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এম এইচ আ



