৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান, মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি চা-শ্রমিকদের
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
প্রকাশিত হয়েছে : 14 August 2026, 9:18 PM
দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯৬ টাকা ৩৭ পয়সা করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন চা-শ্রমিকেরা। এই মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল করে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন তাঁরা। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকনেতারা।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া চা-বাগানে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মুরইছড়া চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ও চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়কৃষানের সভাপতিত্বে সমাবেশ সঞ্চালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্য সত্যজিৎ উরাং। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ, সমন্বয়ক মনীষা ওয়াহিদ, শ্রমিকনেতা ভাগ্য, রাজু উরাং, মনি নায়েক ও মালতি রায়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, চা-শ্রমিকেরা দেশের সবচেয়ে কম মজুরিতে কাজ করেন। বর্তমানে তাঁদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। মাসে ২৬ দিন কাজ করলে একজন শ্রমিকের আয় হয় ৫ হাজার ২৩৬ টাকা। বর্তমান বাজারদরে এই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।
তাঁরা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ শ্রমিকদের মজুরি সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে চা-শ্রমিকদের জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ১০ জুনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, দেশে মানুষের মাসিক গড় আয় ৩০ হাজার ৭৩৯ টাকা। এর সঙ্গে চা-শ্রমিকদের আয়ের তুলনা করলে তাঁদের আয়বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, কোনো কোনো চা-বাগানে দৈনিক হাজিরা পেতে ২৩ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত চা-পাতা তুলতে হয়। এত পরিশ্রমের পরও চা-শ্রমিকেরা দেশের অন্যতম সর্বনিম্ন মজুরি পান।
বক্তাদের ভাষ্য, ২০২৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে দৈনিক মজুরি প্রায় ৯ টাকা ৩৭ পয়সা বাড়ছে। বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে এই সামান্য বৃদ্ধি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চা-শ্রমিকেরা জানান, সম্প্রতি কুলাউড়া সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের জন্য সংসদে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কয়েকজন সংসদ সদস্যও এ বিষয়ে আলোচনা করেন। শ্রমমন্ত্রী বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে আশ্বস্ত করলে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করা হয়।
পরে শ্রমমন্ত্রীর চা-শ্রমিকেরা হাজিরার বাইরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পান—এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেন বক্তারা। তাঁরা এটিকে বাগান মালিকদের প্রচারণা বলে দাবি করেন।
বক্তারা বলেন, চা-শিল্পে প্রতিবছর উৎপাদনের নতুন রেকর্ড হলেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে না। নিলামে চায়ের দাম বাড়লেও মালিকেরা লোকসানের কথা বলে শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে অনাগ্রহী। সরকারের পক্ষ থেকেও মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
তাঁরা আরও বলেন, ১৮৫ বছর ধরে এ অঞ্চলে বসবাস করেও চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ভূমিহীন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তাঁরা মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ২০২২ সালের আগস্টে ১৯ দিনের আন্দোলনের মাধ্যমে চা-শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির দাবি আদায় করেছিলেন। এবারও রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই ন্যায্য মজুরি আদায় করা হবে।
চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ বলেন, **‘সংসদে নয়, চা-শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাবে রাজপথের লড়াইয়ের মাধ্যমে।’**
তিনি ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল করে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান। মজুরি ৫০০ টাকা করা না হলে আন্দোলন জোরদার করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
এম এইচ আ



