গ্যাস-সংকটে হবিগঞ্জের ১৭১ কারখানা বন্ধ, বেকার দেড় লাখ শ্রমিক
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:
প্রকাশিত হয়েছে : 14 August 2026, 9:06 PM
গ্যাস-সংকট তীব্র হওয়ায় হবিগঞ্জের ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজের বাইরে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এতে রপ্তানি অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও করছেন উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রায় ২০ দিন ধরে হবিগঞ্জে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কম ছিল। তবে গত বুধবার থেকে অনেক কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জেলার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত।
উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। উৎপাদন না থাকায় সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে চলমান অর্ডার বাতিল হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘৩ মিলিয়ন ঘনফুটও বন্ধ হয়ে গেছে’
যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন বলেন, তাঁদের পার্কে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ারপ্ল্যান্টসহ ছয়টি কারখানা রয়েছে। টায়ার ও পাওয়ারপ্ল্যান্ট ছাড়া অন্যগুলো শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন।
তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু কয়েক দিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টার পর সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের শাহজীবাজার আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের প্রধান মো. খালেদ গনি বলেন, হবিগঞ্জে দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্প খাতে সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, ২১ জুলাই থেকে এ সমস্যা শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। তবে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
১৬ হাজার শ্রমিক কাজের বাইরে
বাদশা পাইওনিয়রের মহাব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মো. খায়রুল আলম বলেন, তাঁদের কারখানায় স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ইউনিট রয়েছে। কয়েক দিন ধরে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
তাঁর দাবি, এতে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজের বাইরে রয়েছেন। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট করতে না পারলে কোটি কোটি টাকার রপ্তানি অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক বলেন, ২২ জুলাই থেকে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। বর্তমানে পুরো উৎপাদন বন্ধ।
তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা রয়েছেন। গ্যাসনির্ভর নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা থাকায় গ্যাস না থাকায় কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে না।
৩৫ হাজার কর্মীও উৎপাদনের বাইরে
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার পর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন থেমে গেছে।
শতভাগ রপ্তানিমুখী স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, তাঁদের কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হবিগঞ্জের বর্তমান গ্যাসসংকটের পেছনে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিও বড় কারণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতি আরও বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে।
তাঁদের দাবি, সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
এম এইচ আ



