ডিসেম্বর এলেই আমার ভেতরে কিছু বদলে যায়
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৪২ অপরাহ্ণ
ডিসেম্বর মানেই আমার মনে অন্য রকম একটা অনুভূতি জেগে ওঠে। মনে হয় চারপাশে হাওয়া একটু বেশি নরম, আকাশ একটু বেশি নীল, আর মানুষের মুখে অদ্ভুত এক গর্বের আভা। ছোটবেলায় বুঝতাম না, কিন্তু এখন বুঝি—ডিসেম্বর মানে বিজয়ের মাস, স্বাধীনতার মাস, আমাদের ইতিহাসের গর্বের সময়।
আমি বড়লোকের ছেলে না, নামী স্কুলে পড়িনি। আমার শৈশব কেটেছে গ্রামেই, একটি খুব সাধারণ স্কুলে—দরবেশকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু সেই সাধারণ পরিবেশের মধ্যেই আমি প্রথমবার ইতিহাসের গন্ধ পেয়েছিলাম।
আমার বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে—হয়তো তৃতীয় শ্রেণি থেকেই—ডিসেম্বর মাসকে আমি আলাদা করে অনুভব করতে শুরু করি।
সেই ছোটবেলার ডিসেম্বর—যা আজও ভুলতে পারি না
তৃতীয় শ্রেণির এক সকালে আমি প্রথম বুঝেছিলাম ডিসেম্বর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুলে গিয়ে দেখি মাঠের সামনে বড় করে লাল-সবুজ পতাকা লাগানো। কুয়াশা নিচে নেমে এসেছে, বাতাসে শিশিরের গন্ধ। আমরা সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইছি…কিন্তু সেদিন একটু অন্যরকম লাগছিল।
আমার শিক্ষক বলেছিলেন,“বাচ্চারা, ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এই মাসে স্বাধীনতা এসেছে।”
আমি তখন খুব ছোট। ঠিকমতো সব বুঝিনি। কিন্তু মনে হয়েছিল—এটা খুব মূল্যবান একটা কথা। ইতিহাসের কোনো গুরুতর গল্প আছে এর পেছনে।
সেই দিনটাই ছিল আমার ইতিহাস অনুভব করার শুরু।
মায়ের কথাগুলো আমাকে বড় বানিয়ে দেয়
রাতে বাড়ি ফিরে আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম—ডিসেম্বর কেন বিজয়ের মাস?
মা তখন চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,“আমাদের স্বাধীনতা আসতে অনেক মানুষ মরেছে রে বাপ। অনেক মা সন্তান হারিয়েছে। অনেক পরিবার ভেঙে গেছে। সেই রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন। তাই ডিসেম্বর আমাদের গর্বের সময়।”
আমি মায়ের চোখে অদ্ভুত এক দুঃখ দেখেছিলাম। সেই দুঃখে ছিল গর্ব।
সেই গর্বে ছিল ভয়। আর সেই ভয়েই ছিল ইতিহাস।
মায়ের গল্পগুলো আমাকে ছোটবেলাতেই বুঝিয়ে দিয়েছিল—দেশ মানে শুধু জমি না, পতাকা না, মানচিত্র না। দেশ মানে মানুষের ত্যাগ, মানুষের কান্না, মানুষের সাহস।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিসেম্বর আমার কাছে আরও গভীর হয়ে উঠল স্কুল জীবন বাড়তে থাকল, ক্লাস বদলাল, বয়স বাড়ল…কিন্তু ডিসেম্বরের অনুভূতি বদলায়নি। বরং প্রতি বছর তা আরও গভীর হয়েছে।
১৬ ডিসেম্বর এলেই পুরো স্কুলময় এক উৎসবের আমেজ। আমরা বক্তৃতা পড়তাম, গান গাইতাম, শহীদ মিনারে ফুল দিতাম। সেদিন যেন সবাই একসঙ্গে হয়ে যেত, কেউ বড় ছোট থাকত না।
জাতীয় সংগীত গাইতে গাইতে বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক কম্পন হতো।
মনে হতো—আমি যেন সেই লাখো মানুষের কাছে দাঁড়িয়ে আছি, যারা এই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে।
আজ আমি তরুণ—আর ডিসেম্বর আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এখন আমি ১৮–১৯ বছরের। অল্প বয়স, অনেক স্বপ্ন।
কিন্তু জীবনের অনেক কিছুই শিখেছি ডিসেম্বর আমাকে বারবার ভাবিয়েছে বলে।
আমি বুঝেছি— দেশকে ভালোবাসা শুধু “জয় বাংলা” বলার মধ্যে নেই।
দেশপ্রেম শুধু পোস্ট দেওয়ার মধ্যে নেই। দেশপ্রেম হলো—নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা।দেশপ্রেম হলো—নিজের জায়গায় সৎ থাকা।দেশপ্রেম হলো—অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা।
আমার ভাবতে ভালো লাগে—যে দেশের জন্য এত মানুষ জীবন দিল, সেই দেশের জন্য আমি কি করছি? আমার কাজ কি দেশের বোঝা, নাকি দেশের শক্তি?
ডিসেম্বর আমাকে এই প্রশ্নগুলো করে। আর সেই প্রশ্নগুলো আমাকে বদলে দেয়, আমাকে বড় করে।
আমার স্বপ্ন—দেশের জন্য কিছু করা। আমি জানি, আমি এখনো অনেক ছোট। বড় কোনো পদে নেই, বড় কেউ না। কিন্তু তবু আমার ভেতরে একটা স্বপ্ন আছে—আমি একদিন আমার দেশের জন্য কিছু করব।
হয়তো লেখালেখির মাধ্যমে, হয়তো মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরে,
হয়তো সত্য কথা বলার সাহস দিয়ে… কারণ আমি বিশ্বাস করি—
যেকোনো ভালো কাজ শুরু হয় একটি ছোট দায়িত্ববোধ থেকে।
আমাদের সংগ্রামী ইতিহাস আমাকে শিখিয়েছে—
একজন মানুষও দেশ বদলাতে পারে, যদি সে সত্যিকারের সাহসী হয়।
ডিসেম্বর আমাকে মনে করিয়ে দেয়—আমি স্বাধীন দেশের সন্তান
এখনো ডিসেম্বর এলে আমি সেই পুরনো দিনের মতো থমকে যাই।
লাল-সবুজ পতাকা দেখলে মনে হয়—এটায় শুধু রঙ নেই, এতে মানুষের রক্ত আছে, স্বপ্ন আছে, বিশ্বাস আছে।
এই পতাকা আমাকে মনে করিয়ে দেয়—আমি একজন স্বাধীন দেশের সন্তান।
আমার পথচলা, আমার অস্তিত্ব, আমার নাম—সবই এই দেশের উপহার।
একবার ভেবে দেখুন— যে দেশটি না থাকলে আমি “বাংলাদেশি” পরিচয়টাই পেতাম না, সেই দেশকে ভালোবাসা কি আমার দায়িত্ব নয়?
আমার কাছে অবশ্যই আছে। এটাই ডিসেম্বর আমাকে শেখায়।
শেষ কথা—আমি নজরুল, এই দেশের সন্তান, এই দেশের ভবিষ্যৎ
দরবেশকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই ছোট্ট শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া আমার ইতিহাস বোঝা আজও থামেনি। বরং আমি যত বড় হচ্ছি, ডিসেম্বর তত আমাকে বদলে দিচ্ছে, তত আমার চিন্তা গভীর হচ্ছে।
আমি বিশ্বাস করি— ভালো মানুষই হলো এক দেশের আসল সম্পদ।
আর সেই ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা আমি চালিয়ে যাচ্ছি।
আমি নজরুল— এই দেশের ছেলে, এই দেশের ইতিহাসের ধারক,
এই দেশের ভবিষ্যতের একজন অংশীদার।
আর ডিসেম্বর আমাকে প্রতি বছর নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—
আমি যেন কখনো ভুলে না যাই, আমি কার দেশের সন্তান।
লেখক : শিক্ষার্থী, চকরিয়া, কক্সবাজার।




