লাফার্জহোলসিম এর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ: এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র ক্ষোভ
সিকডে
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ মার্চ ২০২৬, ৪:১৩ অপরাহ্ণ
শিল্প নগরী ছাতকে ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি। ছাতকের বহু ব্যক্তি ও পরিববার ব্যবসা ও চাকুরীসূত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই কোম্পানির সাথে জড়িত। পক্ষান্তরে ছাতকের নোয়ারাই ইউনিয়নের আয়নুল আহমেদ নামের এক ব্যক্তিবহুজাতিক এই সিমেন্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রশাসন, আদালত ও জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ দায়ের করে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটার চেষ্টা করে চলেছে। ছাতকের বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়েছে ছাতকের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এর মালিক মিজানুর রহমান, জয়নাল আবেদীন ও ফয়জুর রহমান সহ অনেকের সাথে।
তারা অভিযোগ করেন, “আয়নুল বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ইস্যু তৈরি করে নিজে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে। সে নিজে একটা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা খুলেছে। যেই সংস্থার কোন অফিস নাই। আছে শুধু লেটার হেড। নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী অফিসে কোম্পানির নামে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে কাজ বাগিয়ে নেয়ার চেষ্টাই তার একমাত্র কাজ।”
আয়নুলের প্রতিষ্ঠান ‘নাগরিক পরিবেশ ও যুব কল্যাণ সংস্থা’ সম্পর্কে এলাকাবাসীরা আরো জানান যুব কল্যাণ বা পরিবেশ বিষয়ক কাজের সাথে ভূইফোড় এই প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পর্ক নেই। লাফার্জহোলসিম এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং কোম্পানির কাজে বাগড়া দেয়া ছাড়া আয়নুলের প্রতিষ্ঠানকে কখনো কোনো কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
২০১৮ সালে আয়নুল তার সংগঠনের ব্যানারে লাফার্জহোলসিম এর বিরুদ্ধে বায়ু, পানি ও মাটি কাটার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি করার অভিযোগ করে। মহামাণ্য আদালত তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধির সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে আয়নুলের অভিযোগের কোন সত্যতা পায়নি। তথাপি তদন্ত কমিটি লাফার্জহোলসিমকে অতিরিক্ত ডাস্ট কালেক্টর বসানোসহ কিছু সুপারিশ করেছিল। লাফার্জহোলসিম সেই সকল সুপারিশ বাস্তবায়ন করে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
লাফার্জ কয়েক বছর পর পর জেলা প্রশাসকের অনুমতি স্বাপেক্ষে স্থানীয় ঠিকাদারদের মাধ্যমে মাটি সংগ্রহ করে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো যখনি লাফার্জহোলসিম মাটি সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেয়, আয়নুল প্রশাসন ও আদালতের দ্বারস্থ হয়ে কোম্পানিকে হয়রানি করার চেষ্টা করে। একই সাথে তলে তলে কোম্পানির কাছ থেকে মাটি সরবরাহের অর্ডার বাগিয়ে নেবার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। ২০২১ ও ২০২৩ সালেও সে এমনটি করেছিল। বর্তমান ২০২৬ সালেও তার একই ধরণের দৌড়ঝাঁপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে একই এলাকার আখলুস মিয়া বলেন, “আয়নুল যে মামলা করেছে তার কোন ভিত্তি নাই। ছাতকের অনবাদী জমি থেকে মাটি সংগ্রহের অনুমতি লাফার্জহোলসিম এর রয়েছে। সকল নিয়ম ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করে এই কার্যক্রম অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এই মাটি সংগ্রহের সাথে এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জমির মালিকরা অনেকাংশে নির্ভরশীল। এসময় অনেক লোকের কর্মসংস্থান হয় এবং স্থানীয়রা ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা আয় করেন। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও আয়নুল কৌশলে এবং কোম্পানিকে চাপ প্রয়োগ করে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বিভিন্ন সময়ে মাঠে এসে বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এবং কোম্পানিকে চাপ প্রয়োগ করতেই সে এই মামলা করেছে।”
২০১৮ সালে দায়ের করা মামলা ২০২৬ সালে এসে হঠাৎ করে চালু করা হলো জানতে চাইলে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন “এবার আয়নুল লাফার্জের কাছ ৫ লাখ টন মাটি সরবরাহের ঠিকাদারী চেয়েছিল। সেই কাজ না পেয়ে সে এই মিথ্যা মামলা পুনরায় সচল করেছে।”
সরেজমিনে পরিদর্শন, স্থানীয় এলাকাবাসী ও কৃষকদের সাথে কথা বলে আয়নুলের করা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এই বছর ঠিকাদারের মাধ্যমে নিজের জমির মাটি দিচ্ছেন টেংগারগাও এর কৃষক আব্দুর রহিম।
তিনি বলেন, “যে জমিগুলো থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে সেই জমিগুলোতে আমি কখনও কোন ফসল ফলতে দেখিনি। বছরের পর বছর এই জমিগুলো অনাবাদি পড়ে আছে। আমাদের কোন কাজেই আসেনা। বছরের ৬-৭ মাস এগুলো থাকে পানির নিচে। এগুলোতে না হয় আমন না হয় বোরো। এই জমিগুলো থেকে মাটি কেটে একটু নিচু করে চাষাবাদযোগ্য করে তোলা সম্ভব, যা করতে আমাদের প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়। তাই আমরা লাফার্জের মাটি সংগ্রহ উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকি। লাফার্জ মাটি কাটার ফলে টাকা খরচের বদলে আমাদের একদিকে যেমন টাকা আয় হয়, আবার সেই জমিতে পরবর্তী বছর আমরা বোরো চাষ করতে পারি। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক অনাবাদী জমি এখন আবাদী হয়ে উঠেছে। লাফার্জের মাটি কাটা কৃষকের জন্য আশির্বাদ।”
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, নোয়ারাই ইউনিয়নের মিজানুর রহমান বিগত ১৫-২০ বছরে লাফার্জের কাছ নিজ জমি থেকে মাটি সরবরাহ করে সেই জমিতে ব্যতিক্রমী এক কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন। তার স্বমন্বিত খামারে একাধারে মাছ চাষ হচ্ছে, বোরো চাষ হচ্ছে এবং সারা বছর চলছে হাঁসের খামার। অনাবাদী এই জমি থেকে আয়ের পথ তৈরি করে এলাকায় তিনি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন। তারা দেখাদেখি এলাকায় অনেকেই এই পদ্ধতি অবলম্বনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
লাফার্জহোলসিম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে, কোম্পানির হেড অব কমিউনিকেশনস তৌহিদুল ইসলাম জানান লাফার্জহোলসিম আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রযোজ্য সকল আইন মান্য করে ব্যবসা পরিচালনা করে। বিগত আড়াই দশক যাবত স্থানীয় কমিউনিটির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিবেশসন্মতভাবে প্রতিষ্ঠানটি ছাতকে এই বিশ^মানের কারখানাটি পরিচালনা করছে।
এলাকাবাসী আয়নুলের কার্যক্রমে অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করেছে এবং আশঙ্কা করছে তার এ ধরণের হটকারি কার্যক্রমে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে আয়নুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,পরিবেশ দূষনরোধ, কৃষি জমির মাটি আইন বহির্ভূত ভাবে কাটাসহ বায়ুদূষণ রোধে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমি প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দায়ের করি।
সিলেটসংবাদ/হা




