হাঁস পালনে স্বাবলম্বী হতে স্বপ্ন দেখছেন দোয়ারাবাজারের কুলসুমা
সোহেল মিয়া,দোয়ারাবাজার(সুনামগঞ্জ)
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুলাই ২০২৩, ১০:১৬ পূর্বাহ্ণএকদিকে স্বামীর সংসারের ঘানি অন্য দিকে স্বাবলম্বী হতে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নারী উদ্যোক্তা (গৃহিনী) কুলসুমা বেগম। স্বামী-সংসারে স্বাবলম্বীতা ফিরে এনে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে হাঁস পালন শুরু করে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন তিনি। তার এই প্রচেষ্টা দেখে বাড়তি আয়ের আশায় এলাকার অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন হাঁস পালনে।
কুলসুমার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের হাবিবনগর গ্রামে। তিনি ঐ গ্রামের পাথর শ্রমিক রতন মিয়া’র স্ত্রী ও চার সন্তানের জননী। কুলসুমা বেগম দরিদ্র পরিবারের গৃহিনী হওয়ায়,এনজিও সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়নে, ঢাকা আহসানিয়া মিশন,সৌহার্দ্য (৩ প্রকল্প) ও কেয়ার বাংলাদেশ’র সহযোগিতায় বাস্তবায়নকৃত ও সহযোগিতায় হাসঁ পালনের উপর প্রশিক্ষন গ্রহন করে কুলসুমা বেগম। প্রশিক্ষনের পর হাঁস পালনে আগ্রহ বাড়ে কুলসুমার, আগ্রহ থাকলেও নিজের আর্থিক অবস্থা না থাকায় হাঁস পালনের স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘ দিন বসে থাকেন।
স্বামীর সংসারে অভাব থাকলেও তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের যথাযথ প্রয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে ব্যকারত্ব দূরীকরণের লক্ষে নরসিংপুর ইউনিয়নের ৫ টি গ্রামে একটি করে (ভি.এস.এল. এ) নামে মহিলা সমবায় সমিতি পরিচালনা করেন ঢাকা আহসানিয়া মিশন (সৌহার্দ্য ৩-প্রকল্প)এর নরসিংপুর ইউনিয়ন ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর জহিরুল ইসলাম মজুমদার।এনজিও এই কর্মকর্তার দিকনির্দেশনায় গ্রামের অন্য মহিলাদের মতো নিজেও মহিলা সমিতির সদস্য হয় কুলসুমা বেগম।
২০২২ সালের জুলাই মাসে এনজিও ওই সংস্থার গ্রাম্য মহিলা সমিতির মাসিক বৈঠকে নিজের স্বপ্নের কথা তুলে দরেন কুলসুমা বেগম। পরে হাঁস-মুরগি পালনে কুলসুমা বেগমকে ৪৫০০ টাকা পুঁজি হিসেবে অনুদান প্রদান করে এনজিও সংস্থাটি।
বেসরকারি এনজিও সংস্থা ঢাকা আহসানিয়া মিশন’র দেওয়া টাকা দিয়ে ৫০ টাকা করে ১০ টি টেপি হাস কিনে হাঁস পালনের যাত্রা শুরু করেন কুলসুমা বেগম। ৬ মাস পর ৩০০ টাকা করে একেকটি হাঁস বিক্রি করে লাভবান হওয়ায় রাজহাঁসের উপর আগ্রহ আসে তার। দ্বিতীয় বারে ১’শত টাকা করে ১৫ টি রাজহাঁস কিনে,১৩ টি হাঁসে ডিম দেয়,কিছু ডিম বিক্রি করে ও খেয়ে বাকি ডিম হতে ৪০ টি হাঁসের বাচ্চা পায়। ৪০ টি হাঁসের বাচ্চা থেকে ৩০টি বাচ্চা ১০০ টাকা করে বিক্রি করে ও ১০ টি হাঁস নিজে পালন করেন। বর্তমানে তার ১২ টি রাজহাঁস রয়েছে, একেকটি হাঁসের বাজার মূল্য ১৫০০-২০০০ টাকা।
ভবিষ্যতে তার পরিকল্পনা রাজ হাঁসের ফার্ম করবে।
এদিকে, স্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে তার স্বামী রতন মিয়া স্ত্রীর কাজে সহযোগিতায় হাঁসের ঔষুধ ও খাদ্যসামগ্রী যোগাতে আর্থিক ভাবে সহায়তা করেছেন। মাঝে মধ্যে স্বামী রতন মিয়া হাঁসগুলো দেখাশুনাও করেন। পরিবারের নির্ধারিত কাজের বাহিরে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন নারী উদ্যোক্তা কুলসুমা বেগম।
প্রতিবেশি গৃহিনী নাসিমা বেগম বলেন,কুলসুমার হাঁস পালনে লাভ দেখে আমি ও আশপাশের অনেকের আগ্রহ বেড়েছে। দোয়া করবেন ভবিষ্যতে আমিও কুলসুমা ভাবীর মতো খামার দিয়ে কর্ম করি খাইতে পারি।
কুলসুমা বেগম’র স্বামী রতন মিয়া জানান, কুলসুমা খুবই পরিশ্রমিক ধৈর্যশীল একজন নারী। তার ইচ্ছা সে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে পরিবারকে স্বাবলম্বী করা। আমি পাথর শ্রমিক দিনমজুর তবু আলহামদুলিল্লাহ ঢাল ভাত খেয়ে যাচ্ছি। তবে স্ত্রীর ইচ্ছা সে নিজে কিছু করবে। ঢাকা আহসানিয়া মিশন (সৌহার্দ্য -৩ প্রকল্প) ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর এর পরামর্শ, প্রশিক্ষন এবং তাকে টাকাও দিয়েছে। হাঁস পালনে ব্যাপক সফলতা অর্জন করতে পেরেছে আমার স্ত্রী। সে সংসার দেখাশুনার পাশাপাশি হাঁস-মুরগী পালনে কঠোর পরিশ্রম করছেন এটা আমার কাছে খুবই আনন্দের। আমি তার সাফল্য কামনা করছি।
নারী উদ্যোক্তা কুলসুমা বেগম জানান, আমার ইচ্ছা ছিল নিজের পায়ে দাঁড়াবো। কিছু একটা পালিত করে পরিবারকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করব।কিন্তু হাঁস পালনে ঢাকা আহসানিয়া মিশনের প্রশিক্ষন পাওয়ার পর হাঁস পালন ভাল লাগায় সংসারের ঘানি টেনেও এনজিও সমিতির সহযোগিতায় ১০ টি দেশি টেপি হাঁস দিয়েই যাত্রা শুরু করি। হাঁস ও হাঁসের ডিম বিক্রি করেই অনেক আয় করেছি। আয়ের টাকায় অন্যান্য রাজহাঁস কিনেছি। এখন আমার আত্মনির্ভরশীল হতে হবে এবং আমাকে দেখি গ্রামের আট দশ জন মহিলা আত্মকর্মস্থানের সৃষ্টি করবে এটাই আমি চাচ্ছি। কোন ব্যাংক অথবা কোন সংস্থা থেকে বড় ধরণের ঋণ সহায়তা পায় তাহলে প্রজেট বাড়ালে ২-৪ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটা আমার চাওয়া।
ঢাকা আহসানিয়া মিশন (সৌহার্দ্য ৩-প্রকল্প) এর
দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রজেক্ট অফিসার( কৃষি ও পুষ্টি) মোহাম্মদ বদরুজ্জামান রনি বলেন, কেয়ার বাংলাদেশ’র সহায়তায় ও ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে ঢাকা আহসানিয়া মিশন সৌহার্দ্য ৩ প্রকল্প গ্রামের বেকার মহিলা ও যুবকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষন ও কর্মসংস্থান যোগানে কাজ করে যাচ্ছে। কুলসুমা বেগম আমাদের সদস্য হয়ে হাঁস মুরগি পালনের উপর প্রশিক্ষন নিয়ে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে হাঁস পালনে আগ্রহী হওয়ায় তাকে প্রথমে ৪৫০০ টাকা দিয়ে হাঁস পালনে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপশি ভেকসিন, ওষুধসহ সব ধরণের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কুলসমা বেগম’র ভবিষ্যৎ স্বপ পূরনেও ঢাকা আহসানিয়া মিশন কাজ করবে,কুলসুমা বেগম’র কমপক্ষে ২ শতাংশ জমি থাকলে তাকে একটি খামার ও বাগান করে দেওয়া হবে।
সরকারি প্রানীসম্পদ অফিসের অধিনে খামারের উপর প্রশক্ষন নিতে ঢাকা আহসানিয়া মিশন সহযোগিতা করবে।
আমরা আশা করছি তার সফলতা দেখে এ উপজেলার অন্যান্য নারী-পুরুষ অনুপ্রোনিত হয়ে খামারি হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
সারাদেশসংবাদ/হান্নান






