সুলেমান কবিরের বই ও কিছু কথা
সুমন চন্দ্র পাল
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ মার্চ ২০২৩, ৮:০৮ অপরাহ্ণপাঠপ্রতিক্রিয়া: নাগডরায় রক্তফুল পাওয়া যায়
নাগডরায় রক্তফুল পাওয়া যায় কি না জানি না
তবে নাগডরা বিলটি সত্যি দেখতে ইচ্ছে করছে। নাগডরা নামটি মহিমান্বিত হয়েছে এই বইয়ের মাধ্যমে। নামটি একটি সাধারণ নাম থেকে একটি বিশেষ নামে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা যেমন রূপসী বাংলা কাব্যে ধানসিঁড়ি নদীর নাম পাই ঠিক তেমনি নাগডরা নামটি এই বইয়ের বিভিন্ন কবিতায় বারবার এসেছে। একটি বিলের সাথে বিলপাড়ের মানুষের একটা আত্মীক সম্পর্ক থাকে। একটা বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠে আশেপাশের সব প্রাণীদের মধ্যে। বিলের ধান, বিলের মাছ, বিলের পানি এবং বিলের প্রকৃতি সব মিলিয়ে বিলপাড়ের মানুষের সাথে বিলের একটা হৃদ্যতা, একটা সখ্যতা, একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এটা শুধু বিল নয়, হাওর, নদী এমনকি পাহাড়ের সাথেও এ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
বইয়ের প্রচ্ছদে দেখা যায় একটি নারী আকৃতির রক্তিম ছবি। প্রতিটি মানুষই মূলত একটি রক্তফুলের পরিণত রূপ। রক্ত থেকেই আমাদের জন্ম। পুরুষ আর নারীর রক্ত মিলেই একটি শিশুর জন্ম হয়। হাসন রাজার গানে আমরা পাই “লালে ধলায় হইলাম বন্দী পিঞ্জিরার ভিতরে।” সুতরাং রক্ত থেকেই একটি মানুষ বিকাশ লাভ করে। রক্ত ছাড়া কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না—জন্মও দিতে পারে না। সুতরাং রক্তফুল শুধু নারী না- সব প্রাণীই।
এ-বার আসি কবিতার দিকে। কবিতা হলো সাহিত্যের সবচেয়ে উৎকৃষ্টতম শিল্প। কবিতার পাঠোদ্ধার করা তাই এতো সহজ কাজ নয়। একজন রাজমিস্ত্রী যেমন এক এক করে ইটের গাঁথুনি দিয়ে একটি অট্টালিকা তৈরি করেন কবিও ঠিক তেমনি এক এক করে শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেন কবিতা। কবিতার ভাব হলো জমাট বাঁধা শব্দ মালার সমাহার যার ব্যাখ্যা অনেক বিস্তৃত হয়। আবার কবিতাকে এমন একটি ধাঁধার মতো রহস্যময় এক শিল্প যার ব্যাখ্যা সবাই করতে পারে না। আবার কবিতার ভাব সব সময় ব্যাখ্যা করাও যায় না। কবিতা এমন একটা শিল্প যা অনুভব করতে হয়। কোনো গান শোনার পর তা ব্যাখ্যা করা কঠিন ও নিষ্প্রয়োজন—গান অনুভবের বিষয়। কবিতাও এমন অনুভব করতে হয়। কবিতা ব্যাখ্যা করা কঠিন,অনেকটা বেদরকারি ও নিরর্থক। আবার কবিতাকে আমরা একটি চিত্রপটও বলতে পারি। কবিতায় আমরা একটি চিত্র দেখতে পাই, একটি ছবি আমাদের চোখের ভিতরে ভাসতে থাকে। প্রতিটি কবিতা আবার একেকটা গল্পও বলা চলে। কারণ প্রতিটি কবিতায় থাকে এক একটি আলাদা গল্প।
‘নাগডরায় রক্তফুল পাওয়া যায়’ কবিতাগ্রন্থে হাওরের একটা গ্রাম্য চিত্র চিত্রিত হয়েছে। আছে প্রেমের কাহিনি। মানুষ আর প্রকৃতির কথা। আছে গ্রাম তথা হাওরের নিজস্ব কাহিনি নিজস্ব গল্প যে গল্প আর কারো কাছ থেকে ধার করা হয় নি। কবিতায় আছে হাওরের কিছু আঞ্চলিক শব্দ। যা আমার কাছে সার্থক ব্যবহারই মনে হয়েছে। যেমন: ‘ঠাডাপোড়া রইদ, খেদানো, ছাইল্লা ঘাস,নাউ, বাঁতান, আলাট, মালাকুল মউত’ এ-সব শব্দ হাওরের নিজস্ব শব্দ যা অন্য কোনোখানে এ-সব পাওয়া যাবে না। এ-সব শব্দ অভিধানে খোঁজা নিরর্থক। তবে এসব শব্দ নিয়ে একটা অভিধান হতে পারে। হাওর অভিধান। নাগডরার বিলের পাড়ের মানুষের প্রাত্যহিক কাহিনিই তথা হাওরের কাহিনিই মূলত প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন কবিতায় পাই-
“খেলতে খেলতে উজানের বন/গাঢ় হয়ে এলো/ ব্যাটের হাতলে লেগে আছে প্রথম মায়া।”
“কারেন্টের জালে পুঁটিমাছ আটকে আছে/ তার নাম সময়।”
“কতদিন নাগডরায় যাই না/ লাই খেলি না মাছেদের সাথে।” “নাগডরায় পানকৌড়ির খেলা দেখতে দেখতে জানলাম/ ফেলে এসেছি সুতোয় বাধাঁ ফড়িংয়ের শৈশব”। এ-সব তো হাওরের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার, নিত্য দিনের কাহিনি।
এই বইয়ের কিছু কবিতা আমার কাছে বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যহীন মনে হয়েছে। আমারও অজ্ঞতা হতে পারে। মধ্যনগরের সাঁকো একটি কবিতা যার প্রথম দুই লাইনের সাথে পুরো কবিতার মিল পাই না। এরকম আরো কয়েকটা কবিতা আছে। তবে আমার কাছে ভালো লেগেছে আনোয়ারা কবিতাটি। এই বইয়ে এটি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কবিতা আমার এমন মনে হয়েছে। বইটির নাম আনোয়ারাও হতে পারত। তাতেও দোষ হতো না। আবার কিছু কবিতার লাইনও ভালো লাগলো ” তোরা মিইল্ল্যা থাকিস।” আরেকটি, “স্বার্থপরের মতো মিটিয়েছিলাম কোদালের আবদার।” এদিকে দুই তিনটা কবিতায় অন্যান্য কবির কবিতার লাইন ও শব্দ প্রয়োগ হয়েছে এটা ইতিবাচকও হতে পারে। যেমন— আবুল হাসানের একটি কবিতার লাইন হলো, ” দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর।” নাগডরায় রক্তফুল পাওয়া যায় বইয়ে কাছের মানুষ কবিতার একটি লাইন হলো “একাকিত্বের এক ইঞ্চি জমিও আর অনাবাদি রাখবো না।” আবার সোনালি কাবিন এর মাঝে আছে একটি লাইন —” গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল। ” এই বইয়ে কাগজের ফুল কবিতায় আছে — কাগজের ফুল বেচে ঘুম কিনে আনি/ কবুল/ কবুল/কবুল। আরেক কবিতায় জীবনানন্দের “ঘাই” শব্দটি এখানে ব্যাবহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নাগডরায় রক্তফুল পাওয়া যায় বইটি বেশ লেগেছে। প্রচ্ছদ করেছেন সজল মালাকার। বইটি প্রকাশ করেছে গাঙুড় প্রকাশন— প্রকাশক অসীম সরকার। প্রিন্টিং, বাধাঁই, কাগজ, অক্ষর বিন্যাস সবই ভালো লেগেছে। এই বইয়ের কবিতাগুলো পড়ার সময় ছোটবেলার গল্পে ডুবে যাই, ফিরে যাই আমার অতীতে যে অতীত কখনো আর ফিরে পাব না। গ্রামের গল্পে, হাওরের গল্পে, শৈশবের গল্পে ডুবে যাই। একটা কবিতার লাইন আছে এমন—”প্রতিটা ধানের গিটে লেগে থাকে জিলাপির ঘ্রাণ।” একসময় ধান মাড়ানোর সময় ধান দিয়ে গ্রামে জিলাপী রাখা হতো। উৎসব করে খাওয়া হতো। এখনো কি থাকে ধানের গিটে জিলাপির ঘ্রাণ? কারণ গ্রাম তো শহর হচ্ছে। জানি না থাকে কি না। হয়তোবা জিলাপির চেয়েও আরো বেশি কিছুর ঘ্রাণ থাকে হয়তোবা থাকে না। আরেকটি লাইন দিয়েই লেখা শেষ করতে চাই— “সন্তোষ, তোমাদের যাবতীয় সুখ তেলে ভেজে নিয়ো/ নাগডরায় ফরয গোসল শেষে/ রক্তফুলে শুকে নিয়ো আতাঁলের ঘ্রাণ।”
কবি ও সংস্কৃতিকর্মী





