দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন ও চাঁদাবাজি রোধ
সিলেটের কন্ঠ ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে হাঁসফাঁস নিম্ন আয়ের মানুষ। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে নাভিশ্বাস। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ এবং নতুন সরকারের প্রতিশ্রুত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন চায় নিম্ন আয়ের মানুষ। সেই সঙ্গে বাজার ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারে কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল নিম্ন আয়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে এসব দাবি উঠে আসে।
খেটে খাওয়া মানুষ বলছেন, আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় বেড়েছে। প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়েই চলেছে। কেউ চাহিদার চেয়ে পরিমাণে কম খাবার খাচ্ছেন। আবার কেউ ঋণ করে সংসার টিকিয়ে রাখছেন। ঢাকার জিগাতলা এলাকার রিকশাচালক ৪৮ বছর বয়সী সাইদুল রহমান। তিনি বলেন, সারাদিন রিকশা চালিয়েও আয়-খরচের হিসাব মেলে না। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। এখন তো রমজান মাস, আগের মতো দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারব না, আয়ও কমে যাবে। নতুন সরকার নির্বাচনের আগে আমাদের ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেছে, যেটা বাস্তবায়ন হলে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের অনেক উপকার হবে। সাইদুর রহমানের প্রত্যাশা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ থাকুক আর শ্রমজীবীদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হোক নতুন সরকারের পক্ষ থেকে।
নতুন সরকারের প্রতি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশা থাকলেও, সবচেয়ে বেশি আশাবাদী নিম্ন আয়ের মানুষ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অনিশ্চিত আয়, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় সব মিলিয়ে টানাপোড়েনের জীবনে তারা এখন স্বস্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। ধানমন্ডি এলাকার পান বিক্রেতা শফিক (৩৯) বলেন, ছোট পুঁজিতে ব্যবসা করেন। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি, কখনও কখনও সারাদিন বিক্রি করে চালডাল কেনার আয় হয় না। সরকার বাজারদর ঠিক রাখুক, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর উদ্যোগের নেওয়ার দাবি তার।
ফার্মগেটে ফুটপাতের দোকানদার রাশেদ (২৮) সবসময় উচ্ছেদের ভয়ে থাকেন। তিনি বলেন, স্থায়ী জায়গা নেই, বৈধতার নিশ্চয়তা নেই। তার ওপর বাড়তি টাকা দিতে হয়, যার প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। পরিষ্কার নিয়ম আর চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশের দাবি তার। তাহলে তারা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারবেন।
সব মিলিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রত্যাশা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ডের বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি বন্ধ, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার তাদের এই প্রত্যাশার কতটা পূরণ করতে পারে। হাজারীবাগের ট্যানারি মোড়ের দারোয়ান মতিউর (৫৫) জানান, কম বেতনে রাত-দিন ডিউটি করেও নিরাপত্তা নেই। অসুস্থ হলে সহায়তা মেলে না। ন্যূনতম মজুরি হলেও বাড়াতে হবে। সরকার যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর কথা বলছে, আমরা যেন সত্যিই তা পাই। পরিবারের সবাইকে গ্রামে পাঠিয়েছিলাম ভোট দেওয়ার জন্য। এখন দেখার বিষয় সরকার যে ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা হয়।
ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্টদের একাংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। বাজারে পণ্য আনা-নেওয়ার পথে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়ে। নিম্ন আয়ের মানুষ বলছেন, সরকার যদি চাঁদাবাজি বন্ধে দৃশ্যমান অভিযান চালায় এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করে, তাহলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও গাড়ির চালকরা ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি চাচ্ছেন চাঁদাবাজি বন্ধ হোক।
ফার্মগেট-জিগাতলা রুটের লেগুনাচালক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এখন আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্বিগুণ। রাস্তার খরচ, গ্যারেজ ভাড়া, মামলার ভয়, স্ট্যান্ডে নিয়মিত চাঁদা দেওয়া সব মিলিয়ে চাপে থাকতে হয়। তিনি বলেন, রাস্তায় শৃঙ্খলা চাই, অযথা হয়রানি বন্ধ হোক। সবচেয়ে বড় কথা এই নতুন সরকারকে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।
ঢাকার মাছ বিক্রেতা নুরু মিয়া বলেন, পাইকারি আড়তে দাম বেশি হলে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ে। তার ওপর পথে পথে চাঁদা দিতে হয়, ফলে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। বিগত সরকারের বড় ব্যর্থতা ছিল চাঁদাবাজি কমাতে না পারা। নতুন সরকার যেন অন্তত এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ধানমন্ডির শংকরে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ব্যবসা করা ফল বিক্রেতা আবুল কাশেম (৫১) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক দিনে দুই দফায় ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। এভাবে লাভ থাকে না। সরকার বদলায়, কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। এবার চাই নতুন সরকার চাঁদাবাজি বন্ধের দিকটায় কঠোর হোক। রোজায় ফলমূলের দাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ফলমূলের যে দাম তাতে সাধারণ মানুষ কিনতে পারছে না। কেনাকাটা না হলে আমাদের আর লাভ কী হবে। তিনি বলেন, ক্রেতারা যাতে সূলভ মূল্যে কিনতে পারে, আমরাও যেন ন্যায্য লাভ পাই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং বাজার তদারকির ঘাটতি দ্রব্যমূল্য বাড়ার অন্যতম কারণ। খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি জোরদার, টিসিবি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ন্যায্যমূল্যের দোকান বাড়ানো হলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়িয়ে ডিজিটাল ডাটাবেইসের মাধ্যমে স্বচ্ছ বণ্টন নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তারা।




