রোহিঙ্গা শিবিরে স্কুল বন্ধ: শিশুদের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ে
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১:২৯ পূর্বাহ্ণ
রোহিঙ্গা শিবিরে স্কুল বন্ধের মূল কারণ হলো আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া ও তহবিল সংকট, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ দাতা দেশগুলোর অনুদান হ্রাস পাওয়ায় ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন ও আইআরসি-এর মতো সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, ফলে প্রায় ৪ লক্ষাধিক শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং শিশুরা বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমে ঝুঁকে পড়ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশী অনুদান কমানোর সিদ্ধান্তের পর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে হাজার হাজার শিক্ষা কেন্দ্র এবং যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, এই অর্থ সংকটের কারণে তারা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের প্রায় ২৭ শতাংশ অর্থায়ন হারিয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৮০০টি স্কুল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
উখিয়ার একটি শিবিরের ১৭ বছর বয়সী রহিমা (ছদ্মনাম) তার ঝুপড়ির একাকী কোণে বসে চোখ ভিজে ওঠে। তার কান্নার কারণ শুধুই স্বামীর মারধরের যন্ত্রণাই নয়; বরং সেই স্কুলের জন্য যা একসময় তার একমাত্র শান্তির জায়গা ছিল। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে বাবাকে হারানোর পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রহিমার স্বপ্ন ছিল শিক্ষিকা হওয়ার। কিন্তু গত জুনে স্কুলের অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বপ্নও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। স্কুল বন্ধ হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। এখন তার দিন কাটে বদ্ধ ঘরে, স্বামীর নির্যাতন, দীর্ঘশ্বাস এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের সঙ্গে।
রহিমার গল্পটি একান্তই বিচ্ছিন্ন নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অনুদান হ্রাসের ফলে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে শিশুদের জীবন চরম বিপর্যয়ের মুখে। শুধু শিক্ষার অভাব নয়, স্কুলের বন্ধ হওয়া শিশুদের নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকারকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার মোট বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ বিদেশী সহায়তায় ব্যয় করলেও, সেই সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। দ্য ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, এই তহবিল কাটছাঁটের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে, যার মধ্যে ৪৫ লাখের বেশি শিশু। অর্থাৎ সামান্য অর্থের সংকটও বড় মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
শিবিরের স্কুলগুলো কেবল শিক্ষার কেন্দ্রই ছিল না; এগুলো ছিল পাচারকারী ও অপরাধী চক্র থেকে বাঁচার নিরাপদ আশ্রয়। ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে শিশু অপহরণের ঘটনা গত বছরের তুলনায় চার গুণ বেড়ে গেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫৬০টি শিশু অপহরণের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে শিশুদের নিয়োগের হার আট গুণ বেড়েছে, যেখানে ৮১৭ শিশুর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
স্কুল বন্ধ হওয়ায় শিশুরা রাস্তায় খেলাধুলা করছে, যা তাদেরকে পাচারকারীদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। রোহিঙ্গা উইমেন অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক শওকত আরা বলেন, “অনেক শিশুই ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। কেউ বাল্যবিয়ের ফাঁদে, কেউ পাচারকারীদের হাতে। তাদের ফেরানো আর সম্ভব নাও হতে পারে। স্কুল বন্ধ হওয়া মানে শুধু শিক্ষা হারানো নয়, বরং তাদের জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়া।”
স্কুল বন্ধ হওয়ার ফলে শিশুরা জীবিকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। ১০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আরফানের দিন শুরু হয় সকাল ৭টায়। যেখানে তার গণিত শেখার কথা ছিল, সেখানে এখন সে ১৫ কেজি ওজনের একটি কুলার কাঁধে নিয়ে সারাদিন আইসক্রিম বিক্রি করছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা শ্রমের পর তার আয় মাত্র ২০০–৩০০ টাকা। আরফান বলেন, “আমি যখন কাজ করি তখন নিজেরই লজ্জা লাগে। এখন তো আমার পড়ার সময় ছিল। আমার স্বপ্নও এখানে থেমে গেছে।”
একই অবস্থা ১৩ বছর বয়সী রহমত উল্লাহর। স্কুলের বেতন যোগাড় করতে সে ড্রেন থেকে প্লাস্টিক কুড়াচ্ছে। নোংরা পানিতে কাজ করতে গিয়ে তার চোখে বাঁশ ঢুকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তবু সে থেমে নেই। তার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার একটাই কারণ—ভবিষ্যতের স্বপ্ন ধরে রাখা। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকায় সেই স্বপ্ন ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে।
শিশুদের উন্নত জীবনের আশায় সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। ১৭ বছর বয়সী নূর কায়দা জানিয়েছেন, তার দুই কিশোরী আত্মীয় পাচারকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া ১৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ নামে এক কিশোর স্কুল বন্ধ হওয়ায় হতাশ হয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল। কিন্তু দালাল ও পাচারকারী গোষ্ঠীর হাতে পড়ে সে নিখোঁজ। তার বাবা মহিব উল্লাহ ধারদেনা করে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছেলেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলেও, ছেলে এখন বিদেশের মাটিতে নিখোঁজ। মহিব উল্লাহ বলেন, “স্কুল খোলা থাকলে ছেলেটা আমার পাশেই থাকত। আমি হয়তো তাকে হারাতাম না।”
এই অর্থ সংকট শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, খাদ্য নিরাপত্তাকেও প্রভাব ফেলেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, বর্তমানে তারা কেবল আগামী মার্চ পর্যন্ত খাদ্য রেশন সরবরাহ করতে পারবে। রেশন কমে যাওয়ার আতঙ্কে অনেক পরিবার বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে। ইউএনএইচসিআর-এর মতে, এ বছর সমুদ্রপথে পালানো ১ হাজার ৩৪০ জন রোহিঙ্গার এক-তৃতীয়াংশ নিখোঁজ বা মৃত হয়েছে।
শিশুদের জন্য শিক্ষা কেবল বই নয়; এটি ছিল নিরাপত্তা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখন সেই দরজা বন্ধ। রোহিঙ্গা শিবিরে এক প্রজন্মের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং সম্ভাবনা আজ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
গোলাম মোস্তফা, সেভ দ্য চিলড্রেন কক্সবাজারের এরিয়া ডিরেক্টর, বলেন, “২০২৬ সালের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সহায়তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এর ফলে জানুয়ারি থেকে আরও ২০ হাজার শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। আমরা যদি দ্রুত তহবিল পুনর্বিন্যাস করতে না পারি, তাহলে এক পুরো প্রজন্মকে ঝুঁকিপূর্ণ জীবন এবং শারীরিক ও মানসিক হুমকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থার অভাবে শিবিরের শিশুরা শুধু শিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে না; তারা পাচার, শ্রমজীবন ও যৌন নিপীড়নের মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধুই মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং সামাজিক ও নিরাপত্তা সংকটও তৈরি করছে।
রোহিঙ্গা শিশুরা এখন জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মোকাবিলা করছে। তারা স্কুলের পরিবর্তে রাস্তায়, কারখানায় বা পাচারকারীর হাতে ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। শিশুরা শিখছে না শুধু গণিত বা সাহিত্য, তারা শিখছে বেঁচে থাকার জন্য কষ্ট, ভয় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়া।
বিশ্বের দৃষ্টি যদি না যায় এবং শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং জীবিকার জন্য তৎপরতা বৃদ্ধি না পায়, তাহলে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের একটি পুরো প্রজন্মের স্বপ্ন, শিক্ষা ও নরাপত্তা চিরতরে হারিয়ে যাবে। স্কুলগুলোকে পুনরায় চালু করা এবং শিশুরা যাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সেটাই এখন সবচেয়ে জরুরি মাানবক চ্যালেঞ্জ।
রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দাতারা যেন এই শিশুদের ভুলে না যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। পুরো একটি প্রজন্ম যেন ঝরে না পড়ে—এটি এখন বৈশ্বিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দিকেও সুস্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে। বলা হয়, দেশের ভেতর থাকা শরণার্থীদের শিক্ষার অধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে, শিবিরের বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ দেয়ার মতো নীতি গঠন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কাঁধে রোহিঙ্গা সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদী মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সংকট শুধু খাদ্য ও বাসস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ও টেকসই ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : শিক্ষাথী, চকরিয়া, কক্সবাজার।




