ড. ইউনুসকে নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে বিবৃতি প্রসঙ্গে
ইয়াহিয়া নয়ন
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৬:৪০ অপরাহ্ণড. ইউনূসের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে রাজনীতি, ক‚টনীতি, ব্যবসা, শিল্পকলা ও শিক্ষাক্ষেত্রের ৪০ বিশ্বনেতা গত ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। আগস্ট মাসে আবারও তার পক্ষে ১৬০ বিশিষ্ঠজন এক বিবৃতি দিয়েছেন। চিঠিটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় পূর্ণ পাতাজুড়ে বিজ্ঞাপন হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ এমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই চিঠি যে সেটা সংবাদমূল্য বিবেচনায় নয়, এই বৈশ্বিক দুর্যোগকালীন বাজারে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করতে হয়েছে, লবিস্ট দিয়ে বিবৃতি তৈরি ও প্রকাশ করার জন্য।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। এক যুগ আগে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা সরানোর বিষয়ে একটি তথ্যচিত্র স¤প্রচার করা হয়। বর্তমানে ড. ইউনূসের গ্রামীণ টেলিকমের দুর্নীতির অনুসন্ধান চলছে, দুর্নীতি দমন কমিশনে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অর্থ লোপাট, কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ না করে ৪৫ কোটি ৫২ লাখ ১৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ এবং দুই হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সহযোগী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বর্তমানে বহুল বিতর্কিত একটি নাম। তিনি একজন নোবেল বিজয়ী। স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল জয়ী। দুঃখজনক হলেও সত্য যে নিজ দেশের ছোট বড় কোনো শুভকাজে আমরা তাঁকে পাইনা। বরং বিশ্বব্যাংকে প্রভাব খাটিয়ে পদ্মা সেতুর অর্থ বাতিল করেছেন- এমন গুরুতর অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।
প্রতিবার নির্বাচনের আগেই একটা করে সংবাদ হওয়ার মত উপকরণ তৈরি করেন ড.ইউনুস। তিনি শান্তিতে নোবেল পেলেও দেশের চরম অশান্তির রাজনৈতিক সময়ে নিজে একটা দল করে ক্ষমতায় আসতে চেয়েছিলের। স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় দুই নেত্রীকে মাইনাস করে তিনি নিজেই দেশের কর্তা হবেন। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত সরকার আসার পরপরই তিনি দল গড়ার কাজে হাত দিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল প্রেসিডেন্ট হবেন। কিন্তু দেশবাসী তাতে সাড়া দেয়নি।
দেশের কল্যানে তাকে পাওয়া না গেলেও, নিজের সকল দুর্নীতি ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে ঠিকই বিদেশী বন্ধুদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন তিনি। বহুবার তার বন্ধু সেই সময়কার ক্ষমতাশালী ফার্স্টলেডি এবং পরবর্তীতে ওবামা প্রশাসনের নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিংটনকে দিয়েও সরকারের উপর নানা চাপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সফল হয়েছেন কি কখনও? পারেননিতো। বরং নিজের নাম ও সুনামের প্রতি একপ্রকার অবিচার তিনি নিজেই করে চলেছেন।
ড. ইউনূস একজন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তার মানে কি এই যে তিনি দেশের সকলপ্রকার আইন আদালত বা নিয়ম কানুনের ঊর্ধ্বে? তিনি কি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন? যেহেতু করেননি সুতরাং তিনি নিজদেশের যেকোনো আইন বা নিয়মের হাতে বন্দি যেমনটা আমি বা আমার মত সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দেশেতো ভিআইপিদের জন্য কোনো আলাদা আইন করা হয়নি বা সংবিধানেও কোথাও লেখা নেই। উনিতো নোবেল পেয়েছেন গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে যৌথভাবে। আমরা তো ঐ নোবেল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সুইডেন থেকে ভিডিওতে দেখেছি তিনি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষে একজন ঋণ গ্রহীতা মহিলা যৌথভাবে পুরুষ্কার গ্রহন করেন। কিন্তু তার নামতো কখনো তিনি মূখেও আনেন না।
কিন্তু তিনি অবৈধভাবে গ্রামীণ ব্যাংকে ৬ বছর এমডি থাকার মামলা করে হেরে গিয়ে পদ হারানোর পর থেকে আর গ্রামীণ ব্যাংকের নাম নেন না। এটা কি নৈতিক? তাছাড়া কবে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, বা জাতির জনকের সমাধিতে গেছেন? দেশের ক্রান্তিকালে কবে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণে কথা বলেছেন? পাশে দাঁড়িয়েছেন?
ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা চলছে সেগুলো কি সরকার করেছে? একটাও সরকার করেনি। সবটাই করেছে তারই হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান (নোবেলের অংশীদারও বটে) গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অংশীদাররা। শ্রম আদালতে যে মামলা সেটি করেছে গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীরা কারণ কর্মীদের ন্যায্য পাওনা দেয়নি বলেই অভিযোগ। ১৮ টি মামলার বিষয় হচ্ছে কর্মীদের লভ্যাংশের অংশ তিনি পরিশোধ করেননি যা সরাসরি শ্রম আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আরও কিছু মামলা আছে যেগুলো করেছে কলকারাখানা পরিদর্শন কর্তৃপক্ষ আর কর ফাঁকির মামলাতো অনেকদিন ধরেই আলোচনায় আছে। তিনি একজন নবেলজয়ী অথচ তিনি কর ফাঁকি দিয়েছেন! সেটিতো আর মিথ্যে নয়। তথ্য প্রমাণতো প্রকাশ্যেই আছে। কয়েকদিন আগেই তো উচ্চ আদালতের রায়ের পর পরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দাবি করা ১২ কোটি ৪৬ লাখ ৭২ হাজার টাকার বকেয়া কর পরিশোধ করেছেন তিনি।
এবার আসি বিবৃতি প্রসঙ্গে। যেসব নোবেল জয়ীরা বিবৃতি দিয়েছেন তারা কি জানেননা যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন ও নিয়ম আছে যা মেনে চলতে একজন নাগরিক বাধ্য? তাঁরা কি তাদের দেশের নিয়ম লঙ্ঘন করে চলেন? তাদের দেশে কি শ্রমিক ঠকানো, কর ফাঁকি দেয়া জায়েজ? উনারা কি জানেন না ইউনুসের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বাংলাদেশ সরকার করেনি?
আমরা বিশ্বাস করি যে, বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা মানুষগুলো নিজের দেশে আইন মেনে চলেন। আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে? আন্তর্জাতিক আইনের কোথাও কি বলা আছে একজন ব্যক্তি নোবেল পেলেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যাবেন এবং তার বিরুদ্ধে দেশের কেউ কোন মামলা করতে পারবে না? আন্তর্জাতিক আইনে কি বলা আছে যে একটি স্বাধীন দেশের বিচার ব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করা অন্যায় নয়? তারা যে ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে সেটি সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং অমার্জনীয় অপরাধ। ইউনূস সাহেবের মামলা এখন দেশের বিচার ব্যবস্থায় চলমান। সেখানে সাক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কে দোষী আর কে নিরপরাধ। বিদেশীরা কি দেশের সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে? আমাদের সরকার কি সেইসব নোবেল বিজয়ীদের আদেশ নির্দেশ মানতে বাধ্য?
স্বাক্ষরকারীরাতো কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামেরও অংশ নয় যে সেই আদালতের ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ কোন চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তাহলে তাদের কি এই সামান্য জ্ঞানটুকু নাই যে কোনো দেশের বিচার ব্যবস্থার উপর সরকারও হস্তক্ষেপ করতে পারে না। যদি হস্তক্ষেপ করে তাহলে সেই বিচার ব্যস্থা নিরপেক্ষতা হারায়?
এই আমেরিকাইনা কয়দিন আগে বললো দেশে বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন দেখতে চায়। এই কি তাদের স্বাধীন দেখতে চাওয়ার নমুনা? একটি নির্বাচিত সরকারকে হুমকি দিচ্ছে একজন ব্যক্তির মামলা বিষয়ে? এই সাহস তাদের কে দিলো? ইউনূস সাহেব কি নিজেকে বাংলাদেশের আইনের চেয়েও বড় কিছু ভাবছেন? ‘বিবৃতি ভিক্ষা’ করে তিনি কি ভাবছেন বিদেশী বন্ধুরা এসে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করে দিয়ে যাবেন? আমার মনে হয় সরকারের উচিত পাল্টা বিবৃতি দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যে বিবৃতি দাতারা কোন কোন আইন লঙ্ঘনের দায়ে অপরাধী। বিশ্ববাসী দেখুক বুঝুক।
লেখক : সাংবাদিক।






