অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট বিভাগ
সিলেটের কন্ঠ ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে (ইউনিট) সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট বিভাগ। অন্যদিকে একই সময়ে কর্মসংস্থান তৈরিতে সবার পেছনে রয়েছে বরিশাল। তবে ইউনিট ও কর্মসংস্থানে সবেচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক এ শুমারিতে শিল্প ও সেবা খাতের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে গতকাল এ শুমারির ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং বিবিএসের মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিক। এছাড়া স্বাগত বক্তব্য দেন অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ প্রকল্পের পরিচালক দিপংকর রায়।
অর্থনৈতিক শুমারি অনুসারে, গত এক দশকে দেশে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বেড়েছে প্রায় ৩৮ লাখ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থনৈতিক ইউনিট গড়ে উঠেছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। ২০১৩ সালের আগের এক দশকে ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। এবার সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে ঢাকা বিভাগে, যা মোট ইউনিটের প্রায় ২৭ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৫১, রাজশাহীতে ১৪ দশমিক ৩৬, খুলনায় ১২ দশমিক ৭৩, রংপুরে ১১ দশমিক ৪১, ময়মনসিংহে ৬ দশমিক ৬৩ এবং বরিশাল বিভাগে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ ইউনিট রয়েছে। আর সবচেয়ে অনগ্রসর সিলেট বিভাগে মাত্র ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ ইউনিট গড়ে উঠেছে।
জেলাভেদে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট গড়ে উঠেছে ঢাকা জেলায়, যা প্রায় ৯ শতাংশ। এছাড়া চট্টগ্রামে ৫, ময়মনসিংহে ৩, কুমিল্লায় ৩ এবং বগুড়ায় ৩ শতাংশ। সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এসব জেলায় অর্থনৈতিক ইউনিট গড়ে উঠেছে যথাক্রমে দশমিক ২৭, দশমিক ৪২ এবং দশমিক ৪৫ শতাংশ।
দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোয় বর্তমানে নিয়োজিত রয়েছে মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জন। অর্থাৎ এক দশকে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এবার মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, নারীর ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ী, কর্মসংস্থানে পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল ৮৩ দশমিক ৪৬ এবং নারীর ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এবার এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যা ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। সবেচেয় পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল বিভাগ, যা ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। জেলা অনুসারে সবচেয়ে পিছিয়ে বান্দরবান। জেলাটিতে গত এক দশকে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮১ হাজার ৬৪৪ জনের, যা মোট কর্মসংস্থানের মাত্র দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া নড়াইলে দশমিক ৩২, ঝালকাঠিতে দশমিক ৩৭, রাঙ্গামাটিতে দশমিক ৪১ ও খাগড়াছড়িতে দশমিক ৪১ শতাংশ।
অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী ইউনিট রয়েছে ৫৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ, অস্থায়ী ৪ দশমিক ৯১ এবং অর্থনৈতিক গৃহস্থালি ৪১ দশমিক ৫২ শতাংশ। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশই এ খাতের অন্তর্ভুক্ত, যার সংখ্যা ১ কোটি ৫ লাখ। বিপরীতে শিল্প খাতের ইউনিটের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, যা মোট ইউনিটের মাত্র ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাত সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে, যার হার ৪১ দশমিক ৮২ শতাংশ।
শিল্পের আকার অনুযায়ী দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে মাইক্রো ও কুটির শিল্পের প্রাধান্য রয়েছে। মোট ইউনিটের মধ্যে মাইক্রো শিল্পের সংখ্যা ৬৬ লাখ ৩১ হাজার বা ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কুটির শিল্প রয়েছে ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯টি বা ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ক্ষুদ্র শিল্প ৪ দশমিক ২০ শতাংশ, মাঝারি শিল্প দশমিক ৩১ শতাংশ এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
মালিকানার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের হার ৮৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির হার ১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা শহরের তুলনায় বেশি। বর্তমানে পল্লী এলাকায় ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি ইউনিট রয়েছে, যেখানে শহর এলাকায় রয়েছে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি ইউনিট। ২০১৩ সালের তুলনায় উভয় এলাকাতেই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক শুমারির এ চিত্র দেশের অর্থনীতিতে গত এক দশকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও সেবা খাতনির্ভর কাঠামোর বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে শুমারিতে ব্যবসা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আট ধরনের সমস্যায় পড়েন উদ্যোক্তারা। সমস্যাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মূলধনের অভাব, প্রায় ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান এ তথ্য জানিয়েছে।
অন্য সমস্যাগুলো হলো ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা, দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব, কাঁচামালের অপর্যাপ্ততা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পণ্য বিপণনের সমস্যা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট।
এম এইচ আ




