আইসিসির মুখোশ উন্মোচন উইজডেনের
সিলেটের কন্ঠ ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
আগামী মাসে ভারত ও শ্রীলংকার মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ নিয়ে চলছে জলঘোলা। ইতোমধ্যে বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশ দল। তার পরিবর্তে খেলবে এবার স্কটল্যান্ড। নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ভারতের মাটিতে খেলতে চায়নি। বিকল্প ভেন্যু হিসেবে শ্রীলংকায় খেলতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এতে রাজ হয়নি। অথচ গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে পাকিস্তানের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের জন্য ভারতের করা একই ধরনের অনুরোধ ঠিকই রেখেছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। দুটি ঘটনা সামনে রেখে বিখ্যাত ক্রিকেট ম্যাগাজিন উইজডেন প্রশ্ন তুলেছে- এটি কি ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নয়?
এবারের আইপিএল নিলামে রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে টেনেছিল বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের মালিকানাধীন কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কূটনৈতিক টানাপড়েনের বলি হয়েছেন বাংলাদেশের তারকা এ পেসার। ভারতীয় গণমাধ্যমে অনবরত প্রচারিত ‘প্রোপাগান্ডায়’ প্রভাবিত হয়ে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলে।
সেই দাবি মেনে নিয়ে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিতে কেকেআরকে নির্দেশনা দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড-বিসিসিআই। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আসন্ন বিশ্বকাপ ভারতে গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটার, স্টাফ, ফ্যান ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আইসিসিকে ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
কিন্তু নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি আমলে নিতে রাজি হয়নি ভারতীয় জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি। তারা বাংলাদেশকে ভারতের মাটিতেই খেলতে হবে বলে ফরমান জারি করে। অন্যথায় বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়তে পারে বলে হুশিয়ার করে দেয়। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আইসিসি বদলি হিসেবে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
একই ধরনের ঘটনা ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগেও ঘটেছিল। টুর্নামেন্টটি এককভাবে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ভারত জানিয়ে দেয়, তারা পাকিস্তানে সফর করবে না। নিজেদের ম্যাচের জন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবি তুলেছিল দেশটি। দীর্ঘ আলোচনার পর সে দাবি মেনে নেয় আইসিসি। ভারত তাদের সব ম্যাচ দুবাইয়ে খেলে। ভ্রমণের ধকল না থাকা এবং সব ম্যাচ একই মাঠে খেলার ‘বাড়তি সুবিধা’ কাজে লাগিয়ে ভারত টুর্নামেন্টটি জিতেও নেয়।
উইজডেনের ওয়েবসাইটে এ দুটি ঘটনা বর্ণনা করে বলা হয়েছেÑ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ন্যায্যতা আদৌ শর্তসাপেক্ষে কিনা এখন সে প্রশ্ন উঠছে। ভারত তাদের সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য তিন মাস সময় পেয়েছিল; অন্যদিকে সূচি ও গ্রুপ ঘোষণার পর বাংলাদেশের হাতে ছিল মাত্র এক মাস। শুধু সময়ের ব্যবধানই কি আইসিসির ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ডকে’ ন্যায্যতা দিতে পারে?
তাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংকট তৈরিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ভূমিকা কি উপেক্ষা করা যায়? বিসিসিআই কখনই মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে নিরাপত্তার কথা বলেনি। ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’ এ একটি কথাই ছিল ব্যাখ্যা। বাংলাদেশ এটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখেছেÑযদি একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পুরো দলকে কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে?
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত ছিল নিঃশর্ত ও অনুতাপহীন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একজন খেলোয়াড়কে ছেড়ে দিয়ে বিসিসিআই স্পষ্ট বার্তা দেয়Ñ ক্রিকেট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্রিকেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশ তাদের খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় দাঁড়ালেও আত্মসম্মান ও নীতির প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্য হুমকির পথে গেছে। যার ফলে আইসিসির জন্য না বলাটা সহজ হয়েছে বলে মনে করে উইজডেন।
অন্যদিকে ভারত জানে, অর্থনৈতিক শক্তি ও সুপারস্টারদের কারণে তাদের ছাড়া আইসিসি টুর্নামেন্ট প্রায় অচল। তাই তারা পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পেরেছে। লড়াইয়ের পাল্লা শুরু থেকেই ভারতের দিকেই ভারী ছিল, যা দেখিয়ে দেয় কীভাবে ক্ষমতা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক শক্তি, সিদ্ধান্তকে নিজের পক্ষে বাঁকিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশের সেই সামর্থ্য ছিল না। ফলে এমন এক সিদ্ধান্তের খেসারত তাদের দিতে হয়েছে, যার কথা তারা তিন সপ্তাহ আগেও ভাবেনি। তারা টুর্নামেন্টে ছিল; এখন আর নেই। শুধু নিজেদের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণেই।
উইজডেনের এই বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট- আইসিসি এখন নীতিনৈতিকতা বা ন্যায্যতার মানদণ্ডকে একপাশে রেখে ভারত তোষণে ব্যস্ত। অর্থনৈতিক শক্তির বলে তারা আইসিসি এবং এর বেশির ভাগ সদস্য দেশকে দিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে নিতে পারে। এমন আগ্রাসী বা সর্বগ্রাসী আচরণের সামনে বাংলাদেশের মতো ‘ক্রিকেটপাগল’ দেশের পক্ষে রুখে দাঁড়ানোই একমাত্র সমাধান।




