এনসিপি থেকে পদত্যাগ ও নেতৃত্বে বাড়ছে নিষ্ক্রিয়তা
সিলেটের কন্ঠ ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
নানা কারণ দেখিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি থেকে ক্রমশ পদত্যাগ করছেন দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতারা। পাশাপাশি দলে নিষ্ক্রিয় নেতার সংখ্যাও বাড়ছে। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বাঁধার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ ও নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দেওয়া নেতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে দলের আরও গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা পদত্যাগ করেন। এ নিয়ে গত আট দিনে অন্তত ৯ জন কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছাড়েন।
গত আট দিনে পদত্যাগী নেতারা হলেন তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, খালেদ সাইফুল্লাহ, আজাদ খান ভাসানী, আরিফ সোহেল, মীর আরশাদুল হক, খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মুশফিক উস সালেহীন ও আবুল কাশেম।
এনসিপি ছাড়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারার পদত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। গত ২৭ ডিসেম্বর তিনি দল থেকে পদত্যাগ করে আগামী সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। ওইদিন ফেসবুক পোস্টে
তাসনিম জারা লিখেন, আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়।
এই আলোচনার শেষ না হতেই পদত্যাগ করেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। এ ছাড়া দল ছাড়ার ঘোষণা না দিলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। নির্বাচনী সময় দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতাকে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন দলের দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন।
গত বুধবার এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন তাসনিম জারার স্বামী ও দলটির যুগ্ম আহ্বায়কের খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি দলের পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান ছিলেন। তিনি তার পদত্যাগপত্রে সব পদ ও দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কথা বললেও তাতে কারণ উল্লেখ করেননি।
এর আগে তাসনিম জারার পদত্যাগের দুই দিন পর গত ২৯ ডিসেম্বর দল ছাড়ার ঘোষণা দেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী। তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও দলের কৃষক উইং প্রস্তুতি কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন।
গত ৩০ ডিসেম্বর এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন নেতা আরিফ সোহেল। তিনি তার পদত্যাগের ঘোষণায় নতুন গণরাজনীতি ও জুলাইয়ের গণশক্তিকে সংগঠিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালিত না হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। গত ২৮ ডিসেম্বর এনসিপির পদত্যাগ এবং ফেনী-৩ আসনে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন দলের ফেনী জেলা আহ্বায়ক আবুল কাশেম। নীতিগত কারণে তিনি এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন।
এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে এনসিপি ছাড়েন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক। ‘দল ও বড় অংশের নেতারা ভুল পথে আছে’ উল্লেখ করে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। মূলত ২৫ ডিসেম্বর তার ঘোষণার মধ্য দিয়েই এনসিপি থেকে পদত্যাগের মিছিল শুরু হয়।
এ ছাড়া গাইবান্ধা-৩ আসনে এনসিপি থেকে প্রাথমিক মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) নাজমুল সোহাগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও পরিবর্তনের আকাক্সক্ষায় জাতীয় নাগরিক পার্টি গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী একমাত্র মধ্যপন্থি রাজনীতির ভরসাস্থল ছিল।
একদিনে দুই নেতার পদত্যাগ : এনসিপির নেতাদের দলছাড়ার আলোচনার মধ্যেই গতকাল বিকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন পদত্যাগ করেন। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছি। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেও রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করছি না। দেখা হবে রাজপথে। আমি খান মুহাম্মদ মুরসালীন এতদিন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছি। এ ছাড়া পার্টির মিডিয়া সেল, প্রচার ও প্রকাশনা সেলে কাজ করেছি।’ তিনি বলেন, সম্প্রতি পার্টির নির্বাচনকালীন মিডিয়া উপকমিটির সেক্রেটারি হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেছি। আজ থেকে এনসিপির সব দায়িত্ব ও পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
প্রসঙ্গত, খান মুহাম্মদ মুরসালীনের দাদা খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন ষাটের দশকে শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর লেখা ‘কানা বগির ছা’ ছড়াটি বাংলাদেশের শিশুদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ নামক জীবনীর জন্য তিনি বহুলভাবে সমাদৃত। এ ছাড়া তিনি আল-হামরা লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা, যা বর্তমানে আল-হামরা প্রকাশনী নামে পরিচিত। এই প্রকাশনাটি বর্তমানে পরিচালনা করেন খান মুহাম্মদ মুরসালীন।
গতকাল বিকালে পদত্যাগকারী আরেকজন হলেন এনসিপির মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন। দলের মিডিয়া সেলের প্রধানের পাশাপাশি সালেহীন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব, কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের কো-লিড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এর আগে মেজর (অব.) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, মেজর (অব.) মো. সালাউদ্দিন, আরিফুল ইসলাম তালুকদারসহ বিভিন্ন জেলা ও যুব শাখার নেতাদের কয়েকজন পদত্যাগ করেন।
এনসিপির নেতারা বলেন, কৌশলগত কারণে বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে জামায়াতসহ সমমনার সঙ্গে নির্বাচনে জোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাতে দলের নির্বাহী পরিষদদের সঙ্গে আলোচনা করে, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কেউ দলে থাকবে কিনা বা নির্বাচন করবে কিনা, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে যারা বিরোধিতা করছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।





